জন্মদিনে ভালোবাসায় সিক্ত প্রধানমন্ত্রী
- আপডেট টাইম : ০৬:২৭:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
- / 197
৭১: আনন্দ-উৎসবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন উদযাপন করা হয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশের কোটি কোটি নেতাকর্মীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জন্মদিন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের নেতারা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেচ্ছা জানিয়ে পাঠিয়েছেন উপহারসামগ্রীও।
করোনাভাইরাসের কারণে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের আয়োজনে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক অংশগ্রহণ করেন। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সীমিতসংখ্যক নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বাদ জোহর এবং দেশের সব মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এদিন সকাল ৯টায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার (মেরুল বাড্ডা), সকাল ১০টায় খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (সিএবি) মিরপুর ব্যাপ্টিস চার্চ (২৯ সেনপাড়া, পর্বতা, মিরপুর-১০), সকাল ৬টায় তেজগাঁও জকমালা রানীর গির্জা এবং বেলা ১১টায় ঢাকেশ^রী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের আয়োজনেও প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উদযাপন করা হয়।
১৯৪৭ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার নিভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছার জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা। ডিজিটাল ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রবক্তা স্বপ্নদর্শী এই নেত্রী ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেন এবং ১৯৯৬ সালে প্রথম ও ২০০৮ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে দলকে দেশের নেতৃত্বের আসনে বসাতে সক্ষম হন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। স্থায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্যে স্বনির্ভরতা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ অবকাঠামো, যোগাযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, আইসিটি এবং এসএমই খাতে এসেছে ব্যাপক সাফল্য। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পাদন, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতিসহ জাতীয় জীবনের বহু ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এরপর থেকে ৩৯ বছর ধরে নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আপসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল স্রোতধারার প্রধান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং অন্য রাজনৈতিক জোট ও দলগুলো ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বিজয়ী হয়।
১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বেই তৎকালীন বিএনপি সরকারের পতন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিজয় অর্জন করে আওয়ামী লীগ। গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় প্রধান বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে প্রথমে ১৪ দলীয় জোট এবং পরে মহাজোট গড়ে ওঠে। ১৪ দল ও মহাজোটের তীব্র আন্দোলনের মুখে অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২২ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে ওই বছরের ১৬ জুলাই চাঁদাবাজিসহ দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার হন শেখ হাসিনা। ওই সময় সংসদ ভবন চত্বরের বিশেষ কারাগারে দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস বন্দি ছিলেন তিনি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে এর আগেও কয়েক দফা গৃহবন্দি হয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত চার মেয়াদে ক্ষমতাসীন হয়েছে। ১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি। ওই বছরের ১২ জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে ২৩ জুন সরকার গঠন করে তারা। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে চার-তৃতীয়াংশ আসনে বিশাল বিজয় অর্জনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠিত হয়। দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয় এবং ২০১৮-এর নির্বাচনের পর টানা তৃতীয়বার সরকার গঠিত হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৬ সালের তৃতীয়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম এবং ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে অর্থাৎ মোট তিন দফা বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
গণতন্ত্র এবং দেশের মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামে অসামান্য অবদান রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও ব্যাপক সাফল্যের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ১৯৯৬-০১ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি তার সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ও মধ্যম আয়ের আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে।
এ অঞ্চলে গণতন্ত্র, শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারী শিক্ষার বিস্তার, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনের সংগ্রামে অসামান্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে দেশি-বিদেশি বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। এর মধ্যে সাউথ-সাউথ ভিশনারি পুরস্কার-২০১৪, শান্তিবৃক্ষ-২০১৪, জাতিসংঘ পুরস্কার-২০১৩ ও ২০১০, রোটারি শান্তি পুরস্কার-২০১৩, গোভি পুরস্কার-২০১২, সাউথ-সাউথ পুরস্কার-২০১১, ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০১০, পার্ল এস. বার্ক পুরস্কার-২০০০, সিইআরইএস মেডাল-১৯৯৯, এম কে গান্ধী পুরস্কার-১৯৯৮, মাদার তেরেসা শান্তি পুরস্কার-১৯৯৮, ইউনেস্কোর ফেলিক্স হোফুয়েট-বোয়েগনি শান্তি পুরস্কার-১৯৯৮ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণে অসামান্য অবদানের জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন শেখ হাসিনা।
ভালো কিছু করতে চাই
৭৪তম জন্মদিনে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, যতদিন বেঁচে আছি সম্মানের সঙ্গে যেন বাঁচতে পারি। আমার কাছ থেকে বাংলাদেশের মানুষের যেন উপকারই হয়, মানুষ যেন ভালো থাকে, সেই কাজটুকু যেন করতে পারি। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বক্তব্য রাখেন। অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনিয়র আইনজীবী মাহবুবে আলমের মৃত্যুতে তার সরকারের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য একটি বিরাট ক্ষতি, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতি। কারণ প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও মেধা আমাদের দেশের জন্য রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তিনি অত্যন্ত ধীরস্থির ও ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু বিবেচনা করতেন। অনেক জটিল মামলা ভালোভাবে সমাধান করেছিলেন তিনি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি মনে করি, এই কয়েকটা বছর আমরা দেখেছি বাংলাদেশে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আমরা এই জায়গাটায় এসেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি এ দেশটাকে যেন জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারি।
বাংলাদেশের মানুষ যেন বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে চলতে পারে, ওইটুকুই আমার প্রচেষ্টা আর কিছু নয়। নইলে বাবা-মা সব হারিয়ে রিক্ত নিঃস্ব হয়ে এই দেশে এসে কাজ করা, এটা খুবই কঠিন কাজ। তারপরও শুধু একটা কথা চিন্তা করেছি- যে দেশটাকে আমার বাবা এত ভালোবেসেছেন, তাদের জন্য কিছু করে আমাকে যেতে হবে। তার স্বপ্নটা যেন অপূর্ণ না থাকে সেটি যেন পূর্ণ করতে পারি। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সরকারপ্রধান বলেন, করোনাভাইরাস না এলে আমরা আরও অনেক কাজ করতে পারতাম। তারপরও যত বাধাবিঘ্ন আসুক, সেটি অতিক্রম করার মতো ক্ষমতা বাংলাদেশের মানুষ রাখে। এজন্য বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানাই।
প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন উদযাপন ছিল গতকাল। এ উপলক্ষে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে দলীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।






















