পানি পথে পেঁয়াজের বড় চালান
- আপডেট টাইম : ০৭:২২:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
- / 96
৭১: # ভারতের বিকল্প ১২ দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে
# ছয় লাখ টন আইপি ইস্যু করছেন ব্যবসায়ীরা
# মার্চের মধ্যেই আসবে সাড়ে পাঁচ লাখ টন
# আমদানি করতে ৫০০ ব্যবসায়ীকে অনুমতি
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এবার পানি পথে আসছে পেঁয়াজের বড় চালান। ভারতের বিকল্প হিসেবে ১২ টি দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে এসব পেঁয়াজ। ইতোমধ্যে আমদানির জন্য ছয় লাখ টন পেঁয়াজের আইপি (আমদানির অনুমতি) নিয়েছেন দেশের ছোট-বড় ৫০০ ব্যবসায়ী। যা আগামী মার্চের মধ্যে দেশের বাজারে সরবরাহ করা যাবে। ইতোমধ্যে দেড় লাখ টনের আইপি ইস্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর বিকল্প দেশ থেকে আমদানির অনুমতি নিতে শুরু করেন। সর্বশের্ষ খবর পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা ছয় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন পাঁচ শতাধিক ছোট বড় ব্যবসায়ী। এসব পেঁয়াজ সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বাংলাদেশে ঢুকবে। ভারতের বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেওয়া হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র থেকে।
এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন সংস্থা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক কৃষিবিদ মো. আজহার আলী বলেন, ভারত রপ্তানি বন্ধের পর প্রতিদিন বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি সংগ্রহের ক্ষেত্রে রেকর্ড হচ্ছে। এসব পেঁয়াজ দেশে এলে কোনো সংকট থাকবে না।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, দেশে পেঁয়াজের সংকট মোকাবেলায় আগামী মার্চ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে দেশের পাঁচটি বড় শিল্প গ্রুপ আনবে এক লাখ ৬৫ হাজার টন পেঁয়াজ। অন্য ৩০০ থেকে ৪০০ ব্যবসায়ী মিলে আমদানি করবেন আরো চার লাখ টন। এ জন্য এরই মধ্যে তাদের আমদানির অনুমতিপত্র (আইপি) দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমদানির জন্য অনুমতি নেওয়া এসব পেঁয়াজ আগামী মার্চের মধ্যে দেশের বাজারে ঢুকবে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, পেঁয়াজের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে ভারতের বিকল্প হিসেবে ১২টি দেশের বাজারের সন্ধান করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। দেশগুলো হচ্ছে- দেশগুলো হচ্ছে চীন, মিশর, তুরস্ক, মায়ানমার, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, আফগানিস্তান, সাউথ আফ্রিকা, ইউক্রেন, ভারত, পাকিস্তান ও হোল্যান্ড। এর মধ্যে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, মিসর, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও চীন শীর্ষে রয়েছে। পাঁচটি দেশ থেকেই ৯২ শতাংশ পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৩৮ হাজার ৯৬৫ টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য ৩০৫টি আইপি ইস্যু করেছে কেন্দ্রটি।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বুলবুল বলেন, ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। ভারতসহ ১২টি দেশ থেকে পেঁয়াজের আইপি ইস্যু করা হচ্ছে। আশাকরি, যত দ্রুত সম্ভব সমুদ্রপথে পেঁয়াজ নিয়ে আসবেন আমদানিকারকরা।
জানা গেছে, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত রপ্তানি বন্ধের পর প্রথমবার বড় আকারে বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়। গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে দেশের মোট পেঁয়াজ আমদানির ৪০ শতাংশ বা দুই লাখ ১৬ হাজার টন এসেছে বিকল্প বাজার থেকে। পেঁয়াজ রপ্তানির জন্য চীন, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস, মিসর ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর রপ্তানিকারকদের চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে। ভারত রপ্তানি বন্ধের পর বাংলাদেশে পেঁয়াজ সরবরাহ করতে মরিয়া এসব দেশের রপ্তানিকারকেরা। বাংলাদেশের আমদানিকারকেরাও এসব দেশ থেকে পেঁয়াজ কেনার চুক্তি করছেন। চীন থেকে পেঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র খুলেছেন চট্টগ্রামের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ট্রেড ইমপ্যাক্সের কর্ণধার ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, ভারত রপ্তানি বন্ধের পর চীন, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানি বেড়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় এসব দেশও বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানিতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। পেঁয়াজ আমদানিতে বিকল্প দেশের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রতিযোগিতামূলক দামও পাচ্ছেন বাংলাদেশের আমদানিকারকেরা। ভারতের রপ্তানি বন্ধের পরপরই বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের ক্রয়াদেশের চাপে পেঁয়াজের দাম টনপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ ডলার বাড়িয়ে দেয় তারা। তাতে ৩৮০ ডলারের পেঁয়াজের দাম উঠে সর্বোচ্চ ৫০০ ডলারে। এখন বিকল্প দেশের সংখ্যা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ২০ থেকে ৩০ ডলার করে কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
এদিকে হঠাৎ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে ভারত। এ ঘোষণার পরপরই দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। তবে দেশে প্রায় তিন মাসের পেঁয়াজ মজুদ আছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জে বর্তমানে পেঁয়াজের মজুদের পরিমাণ পাঁচ লাখ ২৫ হাজার টন। তবে বাংলাদেশে পেঁয়াজের মৌসুম আসতে এখনও ছয় মাস বাকি। এই সময়ে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১১ লাখ টন। কমিশনের এ হিসেবে দেখা যায়, আগামী প্রায় তিন মাসের পেঁয়াজ মজুদ আছে। বাকি তিন মাসের পেঁয়াজ আমদানি করেই মেটাতে হবে। অর্থাৎ, মার্চের আগপর্যন্ত আরও প্রায় ছয় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির দরকার পড়বে।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ টন। সাধারণত স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে পেঁয়াজের চাহিদা পূরণ করা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টন। এর মধ্যে ২২-২৫ শতাংশ সংগ্রহকালীন এবং সংরক্ষণকালীন ক্ষতি বাদ দিলে স্থানীয় উৎপাদিত পেঁয়াজ থেকে বাজারে মোট সরবরাহ করা হয় ১৯ লাখ ১৭ হাজার টন। এ ছাড়া ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে চার লাখ ৩৬ হাজার টন। যা ২০১৯ সালে ছিল ছয় লাখ ৭৪ হাজার টন এবং ২০১৮ সালে ছয় লাখ ৯৬ হাজার টন। অর্থাৎ, ২০১৯ ও ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে যথাক্রমে ৩৫ ও ৩৮ শতাংশ পেঁয়াজ কম আমদানি হয়েছে। আমদানি কম হওয়ায় চলতি বছর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজের ব্যবহার বেশি হয়েছে।






















