হামলার শিকার হচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা
- আপডেট টাইম : ০৬:৩৫:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
- / 114
৭১: সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে গেছে। তারা নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অপরাধীদের গ্রেফতার করা হলেও মাঝপথে বিচারপ্রক্রিয়া থমকে যায়। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, আগে যে হামলাগুলো হয়েছে, সেগুলো সরকারের ছাত্র ও যুব সংগঠনের লোকেরাই করেছে। অথবা অন্য কোনো কেউ করেছে। এখনো তারাই করছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকার শক্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটছে।
সবশেষ গত বুধবার দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। ২০২০ সালের শুরু থেকে চলতি সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জন সরকারি কর্মকর্তা আক্রান্ত হয়েছেন। কয়েকজন খুনের শিকারও হয়েছেন। বেশির ভাগ ঘটনায় বিভিন্ন দলের; বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের পদ-পদবিধারী সন্ত্রাসীরা জড়িত। কিছু ঘটনায় উচ্ছেদ অভিযানে কর্মকর্তাদের পিছপা না হওয়া, ঠিকাদারদের মনজয় না করাসহ ছিল নানা কারণ।
এ বিষয়ে সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘একজন ইউএনওর অন্যের নিরাপত্তা দেখার কথা। কিন্তু তার নিজেরই নিরাপত্তা নেই। আমাদের এখানে যে সংস্কৃতিটা চলে আসছে- সরকারি দলের লোকেরা করে। তাই বিচার হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় থাকে।’
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক শহীদুল হক বলেন, ‘আগের ঘটনাগুলোতে বিচার কেন হয়নি তা জানি না। কিন্তু পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দিয়েছে। বিচারের বিষয় আদালতের। বিচারক স্বল্পতা বা মামলা জটের কারণে হয়তো মামলা বিলম্বিত হচ্ছে। বিলম্বিত হলে যেটা হয়, অনেক সময় বিচারপ্রার্থী হতাশ হয়ে যায়। তবে আমি মনে করি যেগুলো স্পর্শকাতর মামলা, সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব শেষ করাই ভালো।’
ঘোড়াঘাটের ইউএনওর ওপর হামলা
গত বুধবার ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় বাসায় থাকা তার বাবা শেখ ওমর আলী মেয়েকে বাঁচাতে এলে তাকেও সন্ত্রাসীরা গুরুতর আঘাত করে। গুরুতর অবস্থায় ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা শেখ ওমর আলীকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওয়াহিদা খানমকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়।
গরিবের ডাক্তারকে পিটিয়ে হত্যা
গত ১৭ জুন খুলনায় খুনের শিকার হন ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত রাইসা ক্লিনিকের পরিচালক ডা. মো. আবদুর রকিব খান। রোগী মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের হামলায় শেখ আবু নাসের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ডা. মো. আবদুর রকিব খান। তার মৃত্যুতে কেঁদেছেন রোগী-স্বজন-বন্ধু-শুভার্থীসহ খুলনাবাসী। তার কাছে অনেকেই ঋণী। জনপ্রিয় এই চিকিৎসক গরিব রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দিতেন। দুস্থ-অসহায় মানুষের কাছে তিনি ছিলেন আপনজন। অনেক রোগীকে বিনামূল্যে এবং নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দেওয়ার কারণে তাকে গরিবের ডাক্তার বলা হতো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাকে নিয়ে অনেকেই শোকপ্রকাশ করছেন।
মিঠাপুকুরে মৎস্য কর্মকর্তার ওপর হামলা
গত ৫ ফেব্রুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় সন্ত্রাসীরা তার কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকতার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেলা ১১টার দিকে মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি সুধীর চন্দ্র জীবনের নেতৃত্বে একদল দুষ্কৃতকারী মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রবেশ করে। এ সময় তারা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কমকর্তা খালেদ মোশাররফের কাছে জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি (এনএটিপি) প্রকল্পের বেড় জাল বিতরণ করা নিয়ে বাকবিত-তায় লিপ্ত হন। এ সময় তারা লাঠি দিয়ে চেয়ার টেবিল ও আসবাবপত্র ভাঙচুর শুরু করেন। একপর্যায়ে দুষ্কৃতকারীরা মৎস্য কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফের ওপর হামলা চালান। এতে তার মাথা ফেটে যায়। তাকে রক্ষা করতে গেলে অফিস সহকারী দেলদার হোসেনও আহত হন।
মিঠাপুকুরে চিকিৎসক দম্পতির বাসায় হামলা
গত ১১ জুলাই মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক দম্পতির বাসায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ওই দিন ভোরে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবীর রনি ও তার স্ত্রী আফসানা লিজার উপজেলা সদরের বাসায় এ ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীরা ওই চিকিৎসক দম্পতিকে মারপিট ও শ্লীলতাহানি ঘটায়। এ ঘটনায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ওই দম্পতি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
উল্লাপাড়ায় কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলা
গত ১৮ মে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ফাতিন মাহতাব মিটু নামে এক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলা চালিয়ে তার কাছ থেকে ২ লক্ষাধিক টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই দিন রোববার সন্ধ্যায় উল্লাপাড়ার শ্রীকোলা গ্রামে সাজু নামের এক ব্যক্তির বাড়ির পাশের রাস্তায় এ ঘটনা ঘটে। এতে ওই কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। তাকে সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফাতিন মাহতাব উল্লাপাড়ার শ্রীকোলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিমের ছেলে।
তানোরে যুবলীগ নেতাদের হামলায় কৃষি কর্মকর্তা আহত
১৯ মে রাজশাহীর তানোরে কথা-কাটাকাটির জেরে ওয়ার্ড আওয়ামী যুবলীগ নেতাদের হামলায় আহত হন উপজেলার কামারগাঁ ইউনিয়নের মাদারীপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব রহমান। ১৯ মে দুপুরে তানোর পৌরশহরের আমশো মেডিকেল মোড় এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত তানোর পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাফিউল ইসলাম সাফিকে আটক করে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামিমুল ইসলাম বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় থেকে দাফতরিক কাজ শেষে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব ও মইনুল মোটরসাইকেল যোগে তানোরে আসার পথে আমশো মেডিকেল মোড়ে একটি ট্রাক্টর তাদের ধাক্কা দেয়। এ সময় ট্রাক্টরের চালকের সঙ্গে বাকবিত-ায় জড়ায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব ও মাইনুল। তবে ওই স্থানে থাকা স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী যুবলীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাফিউল ইসলাম সাফি তার অনুসারীদের নিয়ে কোনো কিছু বোঝার আগেই উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব ও মাইনুলের ওপর হামলা চালান। হামলায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব ইসলামের মাথা ফেটে যায়।
রাজশাহীতে গণপূর্ত প্রকৌশলীর ওপর হামলা
গত ১৭ আগস্ট রাজশাহী গণপূর্ত কার্যালয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের ওপর হামলা চালিয়েছে ঠিকাদার ও তার সহযোগী। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে এ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত ঠিকাদার ও তার সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা হলো- মহানগরীর সাধুর মোড় এলাকার বাসিন্দা ঠিকাদার শাহাবুল মঞ্জুর লিটন (৩১) ও তার ম্যানেজার মহানগরীর চক কাপাসিয়ার বাসিন্দা আতিকুর রহমান (৩২)।
উদ্বিগ্ন ইউএনওরা, নিরাপত্তায় আনসার
এদিকে উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কমিটির সভাপতিও তারা। এতে প্রায়ই ঝুঁকি নিয়ে তাদের অনেক কাজ করতে হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে স্বার্থান্বেষী মহল তাদের ওপর অসন্তুষ্টও হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সরকারি বাসভবনে ঢুকে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পর সরকার দেশের সব ইউএনওর নিরাপত্তায় আনসার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত শুক্রবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, সারা দেশের উপজেলায়ও আনসার মোতায়েন শুরু হয়েছে।
বর্তমানে সারা দেশে ৪৯২টি উপজেলা রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, আপাতত চারজন করে সশস্ত্র আনসার নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে ইউএনওরা চাচ্ছেন- ব্যাটালিয়ন আনসার মোতায়েন করা হোক। প্রশাসন ক্যাডারদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সঙ্গে শুক্রবার সভা করে এ দাবি জানিয়েছেন ইউএনওরা।
২০১৮ সালে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় ব্যক্তিগত ও বাসস্থানের জন্য পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থা করার অনুশাসন দিয়েছিলেন।






















