বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধুর চেয়ে খুনি মোশতাককে নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল পত্রিকাগুলো

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম : ০৫:৩২:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২০
  • / 133

৭১: ‘পরলোকগত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ গতকাল (শনিবার) বিমানে করিয়া তাঁহার নিজ গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় (ফরিদপুর) লইয়া যাওয়া হয় এবং তাঁহাদের পারিবারিক গোরস্থানে পূর্ণ মর্যাদায় দাফন করা হয়। একজন সরকারি মুখপাত্রের বরাত দিয়া বাসস এই খবর পরিবেশন করেন।’

তৎকালীন দেশের সবচেয়ে বড় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের সেদিনের বঙ্গবন্ধুর দাফনের পুরো খবর এটুকুই। সেই সময়কার ‘আওয়ামী সমর্থক’ হিসেবে পরিচিত পত্রিকাটির সিঙ্গেল কলামে মাত্র দুই ইঞ্চি জায়গা পেয়েছিলেন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর দাফনের খবরের চেয়ে তৎকালীন পত্রিকাগুলো খুনি খন্দকার মোশতাকের জীবনী লেখাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৬ আগস্ট সশস্ত্র বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে জাতির পিতার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নিজ গ্রামে। মা-বাবার কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। ১৫ আগস্ট রাতের হামলায় নিহত অন্যদের রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু ১৭ আগস্টের পত্রিকাজুড়ে খুনি মোশতাক সরকারের স্বীকৃতির সংবাদ প্রকাশ করলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দাফনের সংবাদ শুধু মাত্র সিঙ্গেল কলামে প্রকাশ করা হয়।

জানা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৭ আগস্টের দৈনিক বাংলা পত্রিকাও বঙ্গবন্ধুর দাফনের খবরটি সিঙ্গেল কলামে প্রকাশ করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের অন্যদের কোথায় কিভাবে দাফন করা হয় সেটিও ছিল না কোনো পত্রিকায়। সেই দিনের দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রধান সংবাদ ছিল ‘সৌদি আরব ও সুদানের স্বীকৃতি’ তার ওপরে শোল্ডার ছিল ‘নয়া সরকারের সাথে বাদশা খালেদের ইসলামী সংহতি প্রকাশ’। সেদিনের পত্রিকায় ‘দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক’ বলে প্রকাশ করা হয় একটি সংবাদ।

এ ছাড়া ‘নয়া সরকারের প্রতি মওলানা ভাসানীর পূর্ণ সমর্থন’ প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে দৈনিক ইত্তেফাকে ১৭ আগস্টের প্রধান সংবাদ ছিল-‘সৌদি আরব ও সুদানের স্বীকৃতি’। তার শোল্ডার ছিল রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতি বাদশাহ খালেদ ও প্রেসিডেন্ট নিমেরীর অভিনন্দন’। সৌদি আরব ও সুদান স্বীকৃতি জানালেও বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারতের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার’। সেই সংবাদে বলা হয় যে, ভারত সরকার রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে ‘সশস্ত্র বাহিনীর শাসনভার গ্রহণের ঘটনাকে একটি আভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলিয়া অভিমত করিয়াছে’। সংবাদে বলা হয়, ‘ভারত সরকার সতর্কতার সহিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পর্যালোচনা করিয়া দেখিতেছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিতেছেন।’ এছাড়া ‘কারফিউ প্রত্যাহার’, ‘মওলানা ভাসানীর সমর্থন’। জাতির পিতাকে হারিয়ে সারা দেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করলেও সেদিন ‘মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক\ পরিস্থিতি সন্তোষজনক’ প্রকাশ করা হয়। ‘রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ৪০ মিনিটকাল স্থায়ী এই বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।’

যে সংবাদ ছিল না পত্রিকায়: পঁচাত্তরের ১৬ আগস্ট দুপুরে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর লাশ এসে পৌঁছায়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে কফিন নামিয়ে টুঙ্গিপাড়া সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার কাসেম, আব্দুল হাই মেম্বর, আকবর কাজী, মো. ইলিয়াস হোসেন, জহর মুন্সি, সোনা মিয়া কবিরাজ, শেখ নুরুল হক গেদু মিয়া, সোহরাব মাস্টারসহ অন্যরা তার পৈতৃক বাড়িতে লাশ বহন করে আনেন। কফিন খুলে লাশ বের করে ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করানো হয়। রেড ক্রিসেন্টের রিলিফের কাপড় দিয়ে কাফন পরানো হয়। জানাজা শেষে পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সায়েরা খাতুনের কবরের পাশে বঙ্গবন্ধুকে সমাহিত করা হয়। জানাজা ও দাফন শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন মৌলভী আব্দুল হালিম। দাফন অনুষ্ঠানে টুঙ্গিপাড়া, পাটগাতী ও পাঁচকাহনিয়া গ্রামের ৩০/৩৫ জন অংশ নেন। সেনা ও পুলিশ হেফাজতে তড়িঘড়ি করে দাফন সম্পন্ন করা হয়। জানাজায় গ্রামবাসী অংশ নিতে চাইলেও তাদের অনুমতি দেয়া হয়নি।

Tag :

শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুর চেয়ে খুনি মোশতাককে নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল পত্রিকাগুলো

আপডেট টাইম : ০৫:৩২:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২০

৭১: ‘পরলোকগত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ গতকাল (শনিবার) বিমানে করিয়া তাঁহার নিজ গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় (ফরিদপুর) লইয়া যাওয়া হয় এবং তাঁহাদের পারিবারিক গোরস্থানে পূর্ণ মর্যাদায় দাফন করা হয়। একজন সরকারি মুখপাত্রের বরাত দিয়া বাসস এই খবর পরিবেশন করেন।’

তৎকালীন দেশের সবচেয়ে বড় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের সেদিনের বঙ্গবন্ধুর দাফনের পুরো খবর এটুকুই। সেই সময়কার ‘আওয়ামী সমর্থক’ হিসেবে পরিচিত পত্রিকাটির সিঙ্গেল কলামে মাত্র দুই ইঞ্চি জায়গা পেয়েছিলেন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর দাফনের খবরের চেয়ে তৎকালীন পত্রিকাগুলো খুনি খন্দকার মোশতাকের জীবনী লেখাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৬ আগস্ট সশস্ত্র বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে জাতির পিতার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নিজ গ্রামে। মা-বাবার কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। ১৫ আগস্ট রাতের হামলায় নিহত অন্যদের রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু ১৭ আগস্টের পত্রিকাজুড়ে খুনি মোশতাক সরকারের স্বীকৃতির সংবাদ প্রকাশ করলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দাফনের সংবাদ শুধু মাত্র সিঙ্গেল কলামে প্রকাশ করা হয়।

জানা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৭ আগস্টের দৈনিক বাংলা পত্রিকাও বঙ্গবন্ধুর দাফনের খবরটি সিঙ্গেল কলামে প্রকাশ করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের অন্যদের কোথায় কিভাবে দাফন করা হয় সেটিও ছিল না কোনো পত্রিকায়। সেই দিনের দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রধান সংবাদ ছিল ‘সৌদি আরব ও সুদানের স্বীকৃতি’ তার ওপরে শোল্ডার ছিল ‘নয়া সরকারের সাথে বাদশা খালেদের ইসলামী সংহতি প্রকাশ’। সেদিনের পত্রিকায় ‘দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক’ বলে প্রকাশ করা হয় একটি সংবাদ।

এ ছাড়া ‘নয়া সরকারের প্রতি মওলানা ভাসানীর পূর্ণ সমর্থন’ প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে দৈনিক ইত্তেফাকে ১৭ আগস্টের প্রধান সংবাদ ছিল-‘সৌদি আরব ও সুদানের স্বীকৃতি’। তার শোল্ডার ছিল রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতি বাদশাহ খালেদ ও প্রেসিডেন্ট নিমেরীর অভিনন্দন’। সৌদি আরব ও সুদান স্বীকৃতি জানালেও বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারতের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার’। সেই সংবাদে বলা হয় যে, ভারত সরকার রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে ‘সশস্ত্র বাহিনীর শাসনভার গ্রহণের ঘটনাকে একটি আভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলিয়া অভিমত করিয়াছে’। সংবাদে বলা হয়, ‘ভারত সরকার সতর্কতার সহিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পর্যালোচনা করিয়া দেখিতেছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিতেছেন।’ এছাড়া ‘কারফিউ প্রত্যাহার’, ‘মওলানা ভাসানীর সমর্থন’। জাতির পিতাকে হারিয়ে সারা দেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করলেও সেদিন ‘মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক\ পরিস্থিতি সন্তোষজনক’ প্রকাশ করা হয়। ‘রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ৪০ মিনিটকাল স্থায়ী এই বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।’

যে সংবাদ ছিল না পত্রিকায়: পঁচাত্তরের ১৬ আগস্ট দুপুরে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর লাশ এসে পৌঁছায়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে কফিন নামিয়ে টুঙ্গিপাড়া সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার কাসেম, আব্দুল হাই মেম্বর, আকবর কাজী, মো. ইলিয়াস হোসেন, জহর মুন্সি, সোনা মিয়া কবিরাজ, শেখ নুরুল হক গেদু মিয়া, সোহরাব মাস্টারসহ অন্যরা তার পৈতৃক বাড়িতে লাশ বহন করে আনেন। কফিন খুলে লাশ বের করে ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করানো হয়। রেড ক্রিসেন্টের রিলিফের কাপড় দিয়ে কাফন পরানো হয়। জানাজা শেষে পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সায়েরা খাতুনের কবরের পাশে বঙ্গবন্ধুকে সমাহিত করা হয়। জানাজা ও দাফন শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন মৌলভী আব্দুল হালিম। দাফন অনুষ্ঠানে টুঙ্গিপাড়া, পাটগাতী ও পাঁচকাহনিয়া গ্রামের ৩০/৩৫ জন অংশ নেন। সেনা ও পুলিশ হেফাজতে তড়িঘড়ি করে দাফন সম্পন্ন করা হয়। জানাজায় গ্রামবাসী অংশ নিতে চাইলেও তাদের অনুমতি দেয়া হয়নি।