নম্বর প্লেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালালে যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
- আপডেট টাইম : ০৭:২৪:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / 9
৩১ ডিসেম্বরের পর সামনে নম্বর প্লেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালালে আটক করে চালকের কাছে কারণ জানতে চাইবে ট্রাফিক পুলিশ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও নির্দেশনা না মানলে এ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে নতুন নিয়ম কার্যকর করতে গিয়ে নম্বর প্লেটের আকার ও নকশা নিয়ে আপত্তি ওঠায় মোটরসাইকেলের ধরন অনুযায়ী প্লেট তৈরির সুযোগও রাখা হয়েছে।
সড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেলের পরিচয় নিশ্চিত করতে এতদিন পেছনে নম্বর প্লেট প্রদর্শন বাধ্যতামূলক ছিল। এবার সামনে নম্বর প্লেট লাগানোর নির্দেশ দিয়েছে বিআরটিএ। এ জন্য প্রথমে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়।
নির্ধারিত সময়সীমা বাড়ানোর পর অনেক মোটরসাইকেল মালিক বিষয়টি নিয়ে কিছুটা শিথিলতা দেখাচ্ছেন। তবে সময় শেষ হলে নিয়ম না মানার সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ।
মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট লাগানোর সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে যানবাহন শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। বিশেষ করে সিসিটিভি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ক্যামেরার মাধ্যমে সামনের দিক থেকে নম্বর প্লেট শনাক্ত করা সহজ হবে। এতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন কিংবা অপরাধে জড়িত মোটরসাইকেল চিহ্নিত করাও সহজ হবে।
নম্বর প্লেট ও নিবন্ধন নম্বর
সড়কে চলাচলকারী প্রতিটি মোটরযানের পৃথক পরিচিতি নম্বর থাকে। বিআরটিএ নিবন্ধনের সময় প্রতিটি মোটরসাইকেলের জন্য একটি নির্দিষ্ট নম্বর বরাদ্দ করে। এই নম্বরের মাধ্যমেই সরকারি নথিতে যানবাহনটি শনাক্ত করা হয়।
বাংলাদেশে মোটরযানের নিবন্ধন নম্বরের কয়েকটি অংশ রয়েছে। যেমন, ‘ঢাকা মেট্রো-ল-১১-১২৩৪’। এখানে ‘ঢাকা মেট্রো’ দিয়ে নিবন্ধনের এলাকা বোঝানো হয়। ‘ল’ বর্ণটি মোটরসাইকেলের শ্রেণি নির্দেশ করে। আর পরবর্তী সংখ্যাগুলো নিবন্ধনের সিরিজ ও ক্রমিক নম্বরের পরিচয় বহন করে।
মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের ক্ষমতার ভিত্তিতে নিবন্ধন নম্বরের বাংলা বর্ণ নির্ধারণ করে বিআরটিএ। সাধারণত ১২৫ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিনের মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ‘হ’ এবং ১২৫ সিসির বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ‘ল’ বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
নম্বর প্লেট বাধ্যতামূলক কেন
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর মোটরযান নিবন্ধন-সংক্রান্ত বিধানে বলা হয়েছে, নিবন্ধন সনদ ছাড়া কোনো মোটরযান সড়ক, মহাসড়ক কিংবা জনসাধারণের চলাচলের স্থানে চালানো যাবে না। পাশাপাশি মোটরযানে নিবন্ধন নম্বর প্লেট সংযোজন ও প্রদর্শন করাও বাধ্যতামূলক।
দুর্ঘটনা, যানবাহন চুরি, অপরাধ সংঘটন কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্যের ঘটনায় মোটরযান শনাক্ত করতে নম্বর প্লেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট যানবাহন ও মালিকের পরিচয় বের করা সহজ হয়।
সামনে নম্বর প্লেট লাগানোর প্রয়োজনীয়তা
আগে মোটরসাইকেলের পেছনে বিআরটিএ অনুমোদিত ডিজিটাল নম্বর প্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক ছিল। এবার সামনের দিকেও নম্বর প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিএর গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী মোটরসাইকেলের পেছনে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত আরএফআইডিসহ উন্নতমানের রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ ধাতব প্লেটে নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শনের বিধান রয়েছে।
সামনের নম্বর প্লেট থাকলে সিসিটিভি ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় নম্বর শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে মোটরসাইকেল চিহ্নিত করা সহজ হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ডিএমপির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরা মূলত যানবাহনের সামনের দিকের নম্বর প্লেট শনাক্ত করে। ফলে সামনে নম্বর প্লেট না থাকলে ক্যামেরার মাধ্যমে মোটরসাইকেল শনাক্ত করা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ‘বিআরটিএর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই সামনের নম্বর প্লেটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ক্যামেরাগুলোর অবস্থান ও খরচের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। অনর্থক ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব নয়। আবার ক্যামেরা নিচের দিকে স্থাপন করলে কোনো কারণে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
পেছনের নম্বর প্লেট শনাক্ত করার জন্য ক্যামেরা স্থাপনের ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানান রফিকুল ইসলাম। তার মতে, মোটরসাইকেলের পেছনে অন্য যানবাহন থাকলে ক্যামেরায় নম্বর প্লেটের স্পষ্ট ছবি পাওয়া নাও যেতে পারে। পেছন থেকে নম্বর শনাক্তের ব্যবস্থা করতে গেলে ব্যয়ও বাড়বে।
সামনে নম্বর প্লেট থাকার আরেকটি সুবিধা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অপরাধের তথ্য থাকলে সেটি সহজে শনাক্ত করা যাবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এআই ক্যামেরায় কীভাবে শনাক্ত হবে মোটরসাইকেল
গত ২০ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, রাজধানীর বিভিন্ন ট্রাফিক পয়েন্টে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করে যানবাহন নজরদারির ব্যবস্থা চালু করেছে ডিএমপি।
এই প্রযুক্তির সাহায্যে যানবাহন ট্রাফিক আইন অমান্য করলে ক্যামেরায় ধারণ করা নম্বর প্লেট শনাক্ত করে মামলা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট না থাকলে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশকে সরাসরি বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ব্যবস্থা নিতে হবে বলে জানান ডিসি রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, এআই ক্যামেরা নম্বর শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় তথ্য সামনে তুলে ধরে। এতে পুলিশের জনবল কম লাগে। তবে এআই প্রযুক্তিতে নম্বর শনাক্ত করা না গেলেও ডিএমপির অন্যান্য সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বড় করে দেখে নম্বর বের করা সম্ভব। এমনকি কোথাও মোটরসাইকেল পার্ক করা থাকলেও ভিডিও ফুটেজ থেকে সেটির নিবন্ধন নম্বর শনাক্ত করা যায়।
ডিজিটাল নম্বর প্লেট যেভাবে কাজ করে
বাংলাদেশে ব্যবহৃত ডিজিটাল নম্বর প্লেট দেখতে সাধারণ প্লেটের মতো হলেও এতে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বা আরএফআইডি ট্যাগ যুক্ত থাকে। এই ট্যাগে মোটরযানের নিবন্ধনসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
কোনো যানবাহন আরএফআইডি পাঠকযন্ত্রের আওতায় এলে ট্যাগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। পরে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে যানবাহনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
সেতুর টোল আদায়, যানবাহনের তথ্য যাচাই এবং চুরি হওয়া মোটরযান শনাক্ত করার মতো কাজে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়।
তবে আরএফআইডি প্রযুক্তি জিপিএসের মতো নয়। ডিজিটাল নম্বর প্লেট থাকলেই দূর থেকে বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যেকোনো সময় মোটরসাইকেলের অবস্থান জানা যায় না। এ জন্য নির্দিষ্ট পাঠকযন্ত্র ও তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সামনের নম্বর প্লেটের মাপ ও নকশায় পরিবর্তন
প্রথম দফায় বিআরটিএ স্কুটারের সামনের নম্বর প্লেটের মাপ ২০০ বাই ১০০ মিলিমিটার এবং অন্যান্য মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ২৮৫ বাই ৫০ মিলিমিটার নির্ধারণ করেছিল। প্লেটের অক্ষর ও সংখ্যার উচ্চতা কমপক্ষে ২০ মিলিমিটার রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
এ ছাড়া নম্বর প্লেটের পটভূমি সাদা, অক্ষর ও সংখ্যা কালো এবং উপকরণ হিসেবে স্টেইনলেস স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।
তবে নির্ধারিত প্লেটের আকার ও বিন্যাস নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরে গত ১ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। সংশোধিত বিধিমালায় মোটরসাইকেলের নকশা অনুযায়ী সামনের নম্বর প্লেটের আকার, অক্ষরের উচ্চতা ও বিন্যাস পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে এক লাইনে নম্বর লেখার অনুমতিও দিতে পারবে বিআরটিএ।
৩১ ডিসেম্বরের পর কী ব্যবস্থা
বিআরটিএর গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট প্রদর্শনের জন্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘৩১ ডিসেম্বরের পর কোনো মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট না থাকলে ট্রাফিক পুলিশ তাকে আটক করে জানতে চাইবে, নির্ধারিত সময় পাওয়ার পরও কেন তিনি নির্দেশনা পালন করেননি।’
ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে আলাদা করে সতর্কবার্তা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনগণকে বিষয়টি জানিয়েছে। এর বাইরে ট্রাফিক পুলিশের আলাদা করে কিছু করার নেই।
নিউজ লাইট ৭১


















