শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাসানচরে পৌঁছেছে ১৬৪২ জন রোহিঙ্গা

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম : ০৬:৩৮:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০
  • / 72

নোয়াখালীর ভাসানচরে পৌঁছেছে ১৬৪২ জন রোহিঙ্গা। শুক্রবার (৪ ডিসেম্বর) দুপুরে জাহাজে করে তারা পৌঁছলে জেটি থেকে গাড়িতে করে তাদের আবাসস্থলে দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

ভাসানচরে পৌঁছে অনেক রোহিঙ্গা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

এর আগে সকালে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে নিয়ে আসা ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সকাল সোয়া ১০টার দিকে নোয়াখালীর ভাসানচরের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ৭ টি জাহাজ। চট্টগ্রামের বোট ক্লাব, আরআরবি ও কোস্টগার্ডের জেটি থেকে জাহাজগুলো ছেড়ে যায়।

ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য এই রোহিঙ্গাদের বুধবার রাতেই উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। উখিয়া ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো করা হয় কয়েক ডজন বাস। বৃহস্পতিবার সেসব বাসে করে মোট পাঁচটি কনভয়ে উখিয়া থেকে তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়।

চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর রাতে তাদের রাখা হয় বিএএফ জহুর ঘাটির বিএএফ শাহিন স্কুল ও কলেজের ট্রানজিট ক্যাম্পে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে অবগত থাকলেও তাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংস্থাটিকে যুক্ত করা হয়নি বলে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উখিয়া কলেজ মাঠের অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে প্রথম পর্যায়ে ১০টি করে দুইবারে ২০টি বাস রোহিঙ্গাদের নিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার উদ্দেশে রওনা হয়। রোহিঙ্গাদের বহনকারী বাসগুলোর সামনে ও পেছনে র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ছিল। প্রতি ১০টি বাসের বহরে একটি করে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়ি ছিল। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে তাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল ১৪টি জাহাজ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানা গেছে, সব আলোচনা-সমালোচনা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রথম দল স্বেচ্ছায় আজ শুক্রবার ভাসানচরে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রথম ধাপে ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবারকে সেখানে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে আরো বাড়তে পারে। জানা গেছে, ভাসানচরে মোট এক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য ঘর তৈরি করা হয়েছে। যেসব রোহিঙ্গা সেখানে যাবে, তাদের জন্য আগামী তিন মাসের খাদ্য মজুদ আছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। চরে হাঁস-মুরগি পালন ও সবজি চাষেরও সুযোগ থাকবে রোহিঙ্গাদের জন্য। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রথম জাহাজ শুক্রবার সকালে ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা দেবে।’

প্রসঙ্গত, করোনা মহামারীর সময়ে সমুদ্র থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা ৩০৬ জন রোহিঙ্গাকে আগেই ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে তাদের কক্সবাজারে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের দেখভালের জন্য ২২টি স্থানীয় ও বিদেশি এনজিও আগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের ভাসানচরে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে সরকার। ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের প্রথমে নিজ নিজ ক্যাম্প থেকে গতকাল ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে উখিয়া কলেজ মাঠে আনা হয়। সেখানে তাঁবু ও বুথ তৈরি করে তাদের খাবার পরিবেশন করা হয়। পরে তাদের ডাটাএন্ট্রি করে বাসে তোলা হয়। রোহিঙ্গাদের বহনের জন্য শতাধিক বাস এবং ৪০টি মালবাহী কাভার্ড ভ্যান এবং ট্রাক ছিল।

সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় পালংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প, বালুখালী পানবাজার ক্যাম্প, শামলাপুর ক্যাম্প, কুতুপালং ক্যাম্প ও নয়াপাড়া ক্যাম্প থেকে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচর নেয়া হয়। এদের মধ্যে ২৩ নং ক্যাম্পের মাঝি আবুল হাশেম বলেন, ভাসানচরে যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের জোর দেয়া হচ্ছে না। যারা স্বেচ্ছায় যেতে ইচ্ছুক তাদের নেয়া হচ্ছে ভাসানচরে। মিজান নামে এক যুবক জানান, বুধবার রাত থেকে ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের উখিয়া কলেজ ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাদের নাশতা ও খাবার পরিবেশন শেষে বাসে তোলা হয়। তার ধারণা প্রতিটি বাসে ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো রোহিঙ্গা ছিল।

এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের একটি দল নিয়ে প্রথম ২০টি বাস গতকাল সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখান থেকে আজ সকালে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে। এই দলে আড়াই হাজার রোহিঙ্গার ভাসানচরে যাওয়ার কথা রয়েছে। আমরা ভাসানচরে সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি।’ এর আগে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর কার্যক্রম ঘিরে বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপ ঘুরে আসে ২২টি এনজিওর প্রতিনিধিদল।

ওই দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভ‚মি থেকে চার ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে শেল্টার হোম। রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি এই অস্থায়ী আবাসস্থল এখন শহরে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও তার বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে তাদের একটি অংশকে নোয়াখালীর হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের এই দলটিই প্রথম আশ্রয়ের জন্য যাচ্ছে না। এর আগে গত মে মাসে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পৌঁছানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে দুই দফায় নারী-শিশুসহ মোট ৩০৬ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ফিরে আসে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কোয়ারেন্টাইনের জন্য সরকার তাদের ভাসানচরে নিয়ে রেখেছে। এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলকে দেখার জন্য ভাসানচরে পাঠানো হয়। তারা ফেরার পর তাদের কথা শুনে রোহিঙ্গাদের একাংশ ভাসান চরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে বলে জানানো হয়।

সমাজ কল্যাণ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জেসমিন প্রেমা জানান, শুধু আগ্রহী রোহিঙ্গাদের ভাসানচর নেয়ার কাজ করছে সরকার এবং ২২টি উন্নয়ন সংস্থা। তাদের স্থানান্তরের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে সরকার। এসব রোহিঙ্গা জাহাজে ওঠার আগে বিভিন্ন ডাটা এন্ট্রি সাপেক্ষে বরাদ্দকৃত আশ্রয়ণের টোকেন ও চাবি হস্তান্তর করা হবে তিনি জানান।

তিনি আরো জানান, দ্বীপটি বাসস্থানের উপযোগী করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বনায়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আধুনিক বাসস্থান ছাড়াও বেসামরিক প্রশাসনের ও আবাসিক ভবন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ভবন, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও খেলার মাঠ গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সেখানে গরু-ছাগল, মহিষ-ভেড়া, হাঁস-মুরগি, কবুতর পালন করা হচ্ছে। আবাদ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি। পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষও করা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে যেন এক লাখ এক হাজার ৩৬০ জন শরণার্থী বসবাস করতে পারেন সে লক্ষ্যে গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে। ১২০টি গুচ্ছগ্রামে ঘরের সংখ্যা এক হাজার ৪৪০টি। রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবায় দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল এবং চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট-পরবর্তী মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে এ দেশে আশ্রয় নেয় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।

গতকালের চিত্র: স্বেচ্ছায় নোয়াখালীর ভাসানচরে যেতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল সকালেই রোহিঙ্গাদের প্রায় ১০০ পরিবার উখিয়া কুতুপালংয়ের ট্রানজিট ও কলেজ মাঠের পয়েন্টে পৌঁছায়। এসব পয়েন্টে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রতি মুহূর্তে বাড়তে থাকে। এর আগে বুধবার বিকেলে টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের পাঁচ পরিবারের ২৭ জন সদস্য স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যাওয়ার জন্য সন্ধ্যায় উখিয়া ট্রানজিট পয়েন্টে পৌঁছায়। এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি এবং টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের কর্মকর্তা (সিআইসি) নওশের ইবনে হালিম বলেন, ‘বুধবার বিকালে বাসে করে আমার ক্যাম্প থেকে পাঁচটি রোহিঙ্গা পরিবারকে উখিয়ার কুতুপালংয়ের ট্রানজিট পয়েন্ট নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের সেখান থেকে কখন কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’

গতকাল সকালে টেকনাফের শামলাপুর শরণার্থী শিবিরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু রোহিঙ্গা পরিবার মালপত্র নিয়ে ক্যাম্প ইনচার্জের (সিআইসি) কার্যালয়ে পৌঁছেছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাদের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় এই ক্যাম্পের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। টেকনাফ শামলাপুরের সালামত উল্লাহ নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘সাগরে মাছ শিকার করে সংসার চালাতাম। এখন ভালো জীবনের আশায় ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে যাচ্ছি। পুরনো ঘরসহ মালপত্র আট হাজার টাকায় পাশের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। প্রথম আমাদের এখান থেকে উখিয়া ট্রানজিট পয়েন্টে নিয়ে যাবে। পরে সেখান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষ করে এখানে খুব কষ্টের জীবন যাচ্ছিল। তাই উন্নত জীবনের আশায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সেখানে চলে যাচ্ছি। নিজেদের ইচ্ছাতেই যাচ্ছি আমরা।’

শারমিন আক্তার (২০) নামে আরেক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘এখান থেকে ভাসানচরে খুব ভালো হবে। তাই আমরা পুরো পরিবার ভাসানচরে যেতে রাজি হয়েছি। তা ছাড়া এর আগে ৩০ নভেম্বর এই ক্যাম্পে সিআইসি কার্যালয়ে আমরা সবাই মিটিং করেছি। সেখানে বলা হয়, যারা ভাসানচরে ইচ্ছুক তাদের প্রস্তুতি নিতে। ঘরসহ সব পুরনো আসবাবপত্র বিক্রি করে দিয়েছি। উন্নত জীবন দেখছি, তাই সেখানে পাড়ি দিতে রাজি হয়েছি। সেখানে আমাদের থাকার জন্য ঘরসহ চাষাবাদ করতে জমিজমা দেওয়ার কথা বলছে মাঝিরা। আমরা চলে যাবো খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজনরা দেখা করতে এসেছে। আমরা সেখানে যাওয়ার পর ভালো হলে স্বজনরাও যেতে রাজি হবেন। এই পুরো ক্যাম্প থেকে মোট ২৬ পরিবার ভাসানচরে যাচ্ছে বলে শুনেছি।’

নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) দীপক জ্যোতি খীসা বলেন, ‘কক্সবাজারের শরাণার্থী শিবির থেকে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ভাসানচরে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। আমাদেরও সেভাবে প্রস্তুতি রয়েছে।’

ভাসানচর প্রকল্প: ভাসানচর বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা ছোট একটি দ্বীপ। কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তরের জন্য ২০১৭ সালে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যা পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪ কোটি টাকায়। ভাসানচরে নির্মিত প্রতিটি বাড়িতে ১৬টি করে রোহিঙ্গা পরিবার থাকতে পারবে। প্রতিটি গুচ্ছে ১২টি করে বাড়ি রয়েছে। এ রকম ১০০টিরও বেশি গুচ্ছের প্রতিটিতে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও পুকুরের ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া সেখানে বর্ষার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, সৌরচালিত পাম্পের মাধ্যমে ভ‚-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ব্যবস্থা, মাল্টিপারপাস সাইক্লোন শেল্টার, সৌরবিদ্যুৎ, অন্যান্য সরকারি অফিস রয়েছে ।

চ্যালেঞ্জ: ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে সরকারের, যা একটি বড় বোঝা হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সেখানে ৩০৬ জন রোহিঙ্গার জন্য প্রতি তিন মাসে খরচ হয় প্রায় তিন কোটি টাকা। ভাসানচরে রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়লে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ আরো বাড়বে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, এর ফলে কক্সবাজারের ওপরে চাপ কিছুটা কমবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো ভালো হবে। এ ছাড়া কক্সবাজারে ভ‚মিধসের আশঙ্কা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিলে সেই ভয়টাও কিছুটা কমে আসবে বলে তিনি জানান।

নিউজ লাইট ৭১

Tag :

শেয়ার করুন

ভাসানচরে পৌঁছেছে ১৬৪২ জন রোহিঙ্গা

আপডেট টাইম : ০৬:৩৮:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০

নোয়াখালীর ভাসানচরে পৌঁছেছে ১৬৪২ জন রোহিঙ্গা। শুক্রবার (৪ ডিসেম্বর) দুপুরে জাহাজে করে তারা পৌঁছলে জেটি থেকে গাড়িতে করে তাদের আবাসস্থলে দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

ভাসানচরে পৌঁছে অনেক রোহিঙ্গা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

এর আগে সকালে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে নিয়ে আসা ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সকাল সোয়া ১০টার দিকে নোয়াখালীর ভাসানচরের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ৭ টি জাহাজ। চট্টগ্রামের বোট ক্লাব, আরআরবি ও কোস্টগার্ডের জেটি থেকে জাহাজগুলো ছেড়ে যায়।

ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য এই রোহিঙ্গাদের বুধবার রাতেই উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। উখিয়া ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো করা হয় কয়েক ডজন বাস। বৃহস্পতিবার সেসব বাসে করে মোট পাঁচটি কনভয়ে উখিয়া থেকে তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়।

চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর রাতে তাদের রাখা হয় বিএএফ জহুর ঘাটির বিএএফ শাহিন স্কুল ও কলেজের ট্রানজিট ক্যাম্পে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে অবগত থাকলেও তাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংস্থাটিকে যুক্ত করা হয়নি বলে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উখিয়া কলেজ মাঠের অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে প্রথম পর্যায়ে ১০টি করে দুইবারে ২০টি বাস রোহিঙ্গাদের নিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার উদ্দেশে রওনা হয়। রোহিঙ্গাদের বহনকারী বাসগুলোর সামনে ও পেছনে র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ছিল। প্রতি ১০টি বাসের বহরে একটি করে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়ি ছিল। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে তাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল ১৪টি জাহাজ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানা গেছে, সব আলোচনা-সমালোচনা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রথম দল স্বেচ্ছায় আজ শুক্রবার ভাসানচরে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রথম ধাপে ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবারকে সেখানে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে আরো বাড়তে পারে। জানা গেছে, ভাসানচরে মোট এক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য ঘর তৈরি করা হয়েছে। যেসব রোহিঙ্গা সেখানে যাবে, তাদের জন্য আগামী তিন মাসের খাদ্য মজুদ আছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। চরে হাঁস-মুরগি পালন ও সবজি চাষেরও সুযোগ থাকবে রোহিঙ্গাদের জন্য। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রথম জাহাজ শুক্রবার সকালে ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা দেবে।’

প্রসঙ্গত, করোনা মহামারীর সময়ে সমুদ্র থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা ৩০৬ জন রোহিঙ্গাকে আগেই ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে তাদের কক্সবাজারে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের দেখভালের জন্য ২২টি স্থানীয় ও বিদেশি এনজিও আগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের ভাসানচরে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে সরকার। ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের প্রথমে নিজ নিজ ক্যাম্প থেকে গতকাল ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে উখিয়া কলেজ মাঠে আনা হয়। সেখানে তাঁবু ও বুথ তৈরি করে তাদের খাবার পরিবেশন করা হয়। পরে তাদের ডাটাএন্ট্রি করে বাসে তোলা হয়। রোহিঙ্গাদের বহনের জন্য শতাধিক বাস এবং ৪০টি মালবাহী কাভার্ড ভ্যান এবং ট্রাক ছিল।

সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় পালংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প, বালুখালী পানবাজার ক্যাম্প, শামলাপুর ক্যাম্প, কুতুপালং ক্যাম্প ও নয়াপাড়া ক্যাম্প থেকে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচর নেয়া হয়। এদের মধ্যে ২৩ নং ক্যাম্পের মাঝি আবুল হাশেম বলেন, ভাসানচরে যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের জোর দেয়া হচ্ছে না। যারা স্বেচ্ছায় যেতে ইচ্ছুক তাদের নেয়া হচ্ছে ভাসানচরে। মিজান নামে এক যুবক জানান, বুধবার রাত থেকে ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের উখিয়া কলেজ ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাদের নাশতা ও খাবার পরিবেশন শেষে বাসে তোলা হয়। তার ধারণা প্রতিটি বাসে ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো রোহিঙ্গা ছিল।

এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের একটি দল নিয়ে প্রথম ২০টি বাস গতকাল সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখান থেকে আজ সকালে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে। এই দলে আড়াই হাজার রোহিঙ্গার ভাসানচরে যাওয়ার কথা রয়েছে। আমরা ভাসানচরে সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি।’ এর আগে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর কার্যক্রম ঘিরে বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপ ঘুরে আসে ২২টি এনজিওর প্রতিনিধিদল।

ওই দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভ‚মি থেকে চার ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে শেল্টার হোম। রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি এই অস্থায়ী আবাসস্থল এখন শহরে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও তার বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে তাদের একটি অংশকে নোয়াখালীর হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের এই দলটিই প্রথম আশ্রয়ের জন্য যাচ্ছে না। এর আগে গত মে মাসে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পৌঁছানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে দুই দফায় নারী-শিশুসহ মোট ৩০৬ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ফিরে আসে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কোয়ারেন্টাইনের জন্য সরকার তাদের ভাসানচরে নিয়ে রেখেছে। এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলকে দেখার জন্য ভাসানচরে পাঠানো হয়। তারা ফেরার পর তাদের কথা শুনে রোহিঙ্গাদের একাংশ ভাসান চরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে বলে জানানো হয়।

সমাজ কল্যাণ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জেসমিন প্রেমা জানান, শুধু আগ্রহী রোহিঙ্গাদের ভাসানচর নেয়ার কাজ করছে সরকার এবং ২২টি উন্নয়ন সংস্থা। তাদের স্থানান্তরের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে সরকার। এসব রোহিঙ্গা জাহাজে ওঠার আগে বিভিন্ন ডাটা এন্ট্রি সাপেক্ষে বরাদ্দকৃত আশ্রয়ণের টোকেন ও চাবি হস্তান্তর করা হবে তিনি জানান।

তিনি আরো জানান, দ্বীপটি বাসস্থানের উপযোগী করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বনায়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আধুনিক বাসস্থান ছাড়াও বেসামরিক প্রশাসনের ও আবাসিক ভবন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ভবন, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও খেলার মাঠ গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সেখানে গরু-ছাগল, মহিষ-ভেড়া, হাঁস-মুরগি, কবুতর পালন করা হচ্ছে। আবাদ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি। পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষও করা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে যেন এক লাখ এক হাজার ৩৬০ জন শরণার্থী বসবাস করতে পারেন সে লক্ষ্যে গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে। ১২০টি গুচ্ছগ্রামে ঘরের সংখ্যা এক হাজার ৪৪০টি। রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবায় দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল এবং চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট-পরবর্তী মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে এ দেশে আশ্রয় নেয় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।

গতকালের চিত্র: স্বেচ্ছায় নোয়াখালীর ভাসানচরে যেতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল সকালেই রোহিঙ্গাদের প্রায় ১০০ পরিবার উখিয়া কুতুপালংয়ের ট্রানজিট ও কলেজ মাঠের পয়েন্টে পৌঁছায়। এসব পয়েন্টে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রতি মুহূর্তে বাড়তে থাকে। এর আগে বুধবার বিকেলে টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের পাঁচ পরিবারের ২৭ জন সদস্য স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যাওয়ার জন্য সন্ধ্যায় উখিয়া ট্রানজিট পয়েন্টে পৌঁছায়। এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি এবং টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের কর্মকর্তা (সিআইসি) নওশের ইবনে হালিম বলেন, ‘বুধবার বিকালে বাসে করে আমার ক্যাম্প থেকে পাঁচটি রোহিঙ্গা পরিবারকে উখিয়ার কুতুপালংয়ের ট্রানজিট পয়েন্ট নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের সেখান থেকে কখন কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’

গতকাল সকালে টেকনাফের শামলাপুর শরণার্থী শিবিরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু রোহিঙ্গা পরিবার মালপত্র নিয়ে ক্যাম্প ইনচার্জের (সিআইসি) কার্যালয়ে পৌঁছেছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাদের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় এই ক্যাম্পের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। টেকনাফ শামলাপুরের সালামত উল্লাহ নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘সাগরে মাছ শিকার করে সংসার চালাতাম। এখন ভালো জীবনের আশায় ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে যাচ্ছি। পুরনো ঘরসহ মালপত্র আট হাজার টাকায় পাশের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। প্রথম আমাদের এখান থেকে উখিয়া ট্রানজিট পয়েন্টে নিয়ে যাবে। পরে সেখান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষ করে এখানে খুব কষ্টের জীবন যাচ্ছিল। তাই উন্নত জীবনের আশায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সেখানে চলে যাচ্ছি। নিজেদের ইচ্ছাতেই যাচ্ছি আমরা।’

শারমিন আক্তার (২০) নামে আরেক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘এখান থেকে ভাসানচরে খুব ভালো হবে। তাই আমরা পুরো পরিবার ভাসানচরে যেতে রাজি হয়েছি। তা ছাড়া এর আগে ৩০ নভেম্বর এই ক্যাম্পে সিআইসি কার্যালয়ে আমরা সবাই মিটিং করেছি। সেখানে বলা হয়, যারা ভাসানচরে ইচ্ছুক তাদের প্রস্তুতি নিতে। ঘরসহ সব পুরনো আসবাবপত্র বিক্রি করে দিয়েছি। উন্নত জীবন দেখছি, তাই সেখানে পাড়ি দিতে রাজি হয়েছি। সেখানে আমাদের থাকার জন্য ঘরসহ চাষাবাদ করতে জমিজমা দেওয়ার কথা বলছে মাঝিরা। আমরা চলে যাবো খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজনরা দেখা করতে এসেছে। আমরা সেখানে যাওয়ার পর ভালো হলে স্বজনরাও যেতে রাজি হবেন। এই পুরো ক্যাম্প থেকে মোট ২৬ পরিবার ভাসানচরে যাচ্ছে বলে শুনেছি।’

নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) দীপক জ্যোতি খীসা বলেন, ‘কক্সবাজারের শরাণার্থী শিবির থেকে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ভাসানচরে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। আমাদেরও সেভাবে প্রস্তুতি রয়েছে।’

ভাসানচর প্রকল্প: ভাসানচর বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা ছোট একটি দ্বীপ। কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তরের জন্য ২০১৭ সালে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যা পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪ কোটি টাকায়। ভাসানচরে নির্মিত প্রতিটি বাড়িতে ১৬টি করে রোহিঙ্গা পরিবার থাকতে পারবে। প্রতিটি গুচ্ছে ১২টি করে বাড়ি রয়েছে। এ রকম ১০০টিরও বেশি গুচ্ছের প্রতিটিতে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও পুকুরের ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া সেখানে বর্ষার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, সৌরচালিত পাম্পের মাধ্যমে ভ‚-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ব্যবস্থা, মাল্টিপারপাস সাইক্লোন শেল্টার, সৌরবিদ্যুৎ, অন্যান্য সরকারি অফিস রয়েছে ।

চ্যালেঞ্জ: ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে সরকারের, যা একটি বড় বোঝা হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সেখানে ৩০৬ জন রোহিঙ্গার জন্য প্রতি তিন মাসে খরচ হয় প্রায় তিন কোটি টাকা। ভাসানচরে রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়লে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ আরো বাড়বে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, এর ফলে কক্সবাজারের ওপরে চাপ কিছুটা কমবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো ভালো হবে। এ ছাড়া কক্সবাজারে ভ‚মিধসের আশঙ্কা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিলে সেই ভয়টাও কিছুটা কমে আসবে বলে তিনি জানান।

নিউজ লাইট ৭১