মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০২০ সালের মধ্যেই সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়ন চূড়ান্ত

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম : ০৩:১০:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২০
  • / 119

৭১: ২০২০ সালের মধ্যেই সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়ন চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ড্যাপ চূড়ান্ত করতে সর্বশেষ গণশুনানি চলছে। আগামী ৪ নভেম্বর শুনানি শেষে স্টেকহোল্ডারদের মতামত পর্যালোচনা করে একটি পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত ড্যাপ উপহার দেওয়া হবে। সংশোধিত ড্যাপের মূল লক্ষ্য থাকবে নাগরিকবান্ধব ও পরিকল্পিত নগর উপহার দেওয়া। তাই বেশ কিছু পরিবর্তনও আসছে।

দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার সংশোধিত ড্যাপে বেশ কিছু চমকপ্রদ নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূল রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে আবাসিক ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়েছে। রাস্তার প্রশস্ততা অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা নির্ধারিত হবে। রাস্তার প্রশস্ততা হতে হবে কমপক্ষে আট ফুট। ভবনগুলোর নিচতলায় পার্কিং স্পেস রাখার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। বন্যাপ্রবাহ এলাকায় রাস্তা তুলে দিয়ে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে জলাধারের ওপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট থাকবে না- নৌ চলাচলের সুযোগ তৈরি করা হবে সেখানে। এছাড়া এবারের ড্যাপে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিনোদন পার্ক, তিন-চারটি করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কয়েক হাজার কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সংশোধিত ড্যাপ প্রসঙ্গে বলেন, এই ড্যাপে নতুন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হাঁটাপথ, নতুন রাস্তা ও জলাধার বাড়ানোর, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ও ঢাকাকে বাসযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমির মিশ্র ব্যবহারকেও উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে এটা করলে হিতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। যানজট নিরসন ও নগর সরকারের ব্যাপারেও কিছু কথা আছে। প্রস্তাবনাগুলো শুধু থাকলে হবে না। কারণ কিছু গ্রুপ সব সময় ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখে। ব্যবসায়ীরা যেন তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থকে বড় করে না দেখেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থের সংযোগও দরকার। ঢাকাকে ভারমুক্ত করতে হবে। না হলে পদ্মা থেকে পানি এনেও এ শহরকে বাঁচানো যাবে না। সব মিলিয়ে এ জন্য সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন।

ড্যাপ প্রণয়ন কমিটি মনে করে, রাজধানীর যেখানে-সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও এর বাসিন্দাদের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই। একটি বহুতল ভবনে যত যানবাহন যাতায়াত করে, তাতে আশপাশে প্রয়োজনীয় রাস্তা না থাকলে ওই এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। এ অবস্থার নিরসনে আবাসিক বহুতল ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

রাজউকের জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর ৯৯ শতাংশের বেশি ভবন আট তলার নিচে। আর আবাসিক ভবনের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভবনই আটতলার নিচে। যেমন, বংশাল এলাকার তিন হাজার ২৭টি ভবনের মধ্যে ১১ তলা ভবন আছে মাত্র দুটি। ১০ তলা আছে একটি ও ৯ তলা চারটির। আর আটতলা আছে ১৭টি। এক থেকে ছয়তলা ভবনই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে একতলা সর্বোচ্চ- ৬৬৪টি। শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়ায় সাত হাজার ৭২০টি ভবনের চিত্রও প্রায় একই রকম। এমনকি গুলশান-বনানী এলাকায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বহুতল ভবন থাকলেও মোট সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। আট হাজার ৩৩৯টি ভবনের মধ্যে আটতলা আছে ৬৪টি। ৯তলা ৭৪টি। ২২ ও ১৬ তলা আছে দুটি করে। প্রতিটি এলাকার চিত্র একই রকম। এ জন্য ড্যাপে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে এলাকা ভেদে ছয় থেকে আটতলা উচ্চতা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য রাস্তার প্রশস্ততা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তির বিবেচনায় এই বাধ্যবাধকতায় শিথিলতা রাখা হয়েছে। আর বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ রাখা হয়নি।

ড্যাপ প্রণয়ন কমিটির ডেপুটি টিম লিডার খন্দকার নিয়াজ রহমান বলেন, যেসব ভবন এর চেয়ে বেশি উঠে গেছে, সেগুলো থাকবে। ভবিষ্যতে সেসব ভবন আয়ুস্কাল হারালে তখন নতুন নিয়মে ভবন তৈরি হবে। এটা করার মূল উদ্দেশ্য রাজধানীর জনঘনত্ব কমানো।
রাজধানীর কয়েকটি এলাকাকে আবাসিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হলেও সেটা বাস্তব রূপ পায়নি। এক সময় ধানমন্ডি, গুলশান-বনানী, উত্তরাকে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব এলাকায় এখন নানা বাণিজ্যিক কার্যক্রম যুক্ত হয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমও চলছে এসব এলাকায়। এসব মিশ্র এলাকাকে আর আবাসিক হিসেবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আবার মিশ্র এলাকা হলে নাগরিকদের নানা সুবিধাও হয়। উন্নত বিশ্বও এখন মিশ্র এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে নগর পরিকল্পনা করছে।
বর্তমানে যে কোনো আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদনে ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী বা নিচতলায় পার্কিং স্পেস থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশোধিত ড্যাপে নিচতলার পার্কিং থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
এবার ড্যাপে রাস্তার প্রশস্ততা সর্বনিম্ন ৮ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে ছিল ৮ ফুট ৩ ইঞ্চি। তবে রাস্তা ৮ ফুটের চেয়ে কম প্রশস্ত হলে সেখানে দোতলার বেশি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হবে না। সে ক্ষেত্রেও জমির মালিককে আরও দুই ফুট জায়গা ছেড়ে সামনের রাস্তাকে ১০ ফুট প্রশস্ত করতে হবে।

এতদিন ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে রাস্তা তৈরির সুযোগ ছিল। এবার সেটা বন্ধ করে সেখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওয়ার তৈরির কথা বলা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খাল ভরাট করে কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তৈরির কারণে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তাই সব কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তুলে দিয়ে সেখানে নাব্য ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এতে ড্যাপ এলাকায় নতুন ৫৬৬ কিলোমিটার নতুন নৌপথ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া যানজট নিরসনে দুই হাজার ৭৪৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
ড্যাপ এলাকায় ৬২৭টি স্থানে সরকারি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ থাকবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ছোট প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকবে। এ বিবেচনায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে ড্যাপে।

রাজধানীতে নতুন করে জলাধার তৈরির জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় খেলার মাঠগুলোকে ১০ ফুট গভীরতায় খুঁড়ে নিচে পাথর-বালু দিয়ে একটি ফাঁপা ধরনের জলাধার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে ড্যাপে। এর ওপর থাকবে স্বাভাবিক খেলার মাঠ। বৃষ্টি হলেই ক্যাসপিটের মাধ্যমে পানি ওই ফাঁপার ভেতরে ঢুকে যাবে। ফলে ওইসব এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে না। এ রকম ৭৫টি জলাধার তৈরি করা হবে। পুরান ঢাকার লালবাগের আব্দুল আলীম পার্কের জলাবদ্ধতা রোধে পার্কের চারপাশের ওয়াকওয়ের নিচে এ রকম জলাধার তৈরি করে ভালো ফল পাওয়া গেছে বলে জানান ড্যাপ প্রণয়ন কমিটির সদস্য নগর পরিকল্পনাবিদ হিশাম উদ্দিন চিশতি।

এ ছাড়া বিনোদনের জন্য পাঁটটি আঞ্চলিক পার্ক, ৪৯টি জলপার্ক, পাঁচটি ইকো পার্ক ও আটটি ছোট আকৃতির পার্ক তৈরির কথা বলা হয়েছে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ড্যাপে আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো আগে ছিল না। যেমন বালু নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের জমির মালিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগে ড্যাপ প্রণয়নের সময় হাইড্রলজিক্যাল সার্ভে করা হয়নি। এবার হাইড্রলজিক্যাল সার্ভের ওপর নির্ভর করে ড্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে।facebook sharing button 

Tag :

শেয়ার করুন

২০২০ সালের মধ্যেই সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়ন চূড়ান্ত

আপডেট টাইম : ০৩:১০:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২০

৭১: ২০২০ সালের মধ্যেই সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়ন চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ড্যাপ চূড়ান্ত করতে সর্বশেষ গণশুনানি চলছে। আগামী ৪ নভেম্বর শুনানি শেষে স্টেকহোল্ডারদের মতামত পর্যালোচনা করে একটি পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত ড্যাপ উপহার দেওয়া হবে। সংশোধিত ড্যাপের মূল লক্ষ্য থাকবে নাগরিকবান্ধব ও পরিকল্পিত নগর উপহার দেওয়া। তাই বেশ কিছু পরিবর্তনও আসছে।

দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার সংশোধিত ড্যাপে বেশ কিছু চমকপ্রদ নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূল রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে আবাসিক ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়েছে। রাস্তার প্রশস্ততা অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা নির্ধারিত হবে। রাস্তার প্রশস্ততা হতে হবে কমপক্ষে আট ফুট। ভবনগুলোর নিচতলায় পার্কিং স্পেস রাখার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। বন্যাপ্রবাহ এলাকায় রাস্তা তুলে দিয়ে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে জলাধারের ওপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট থাকবে না- নৌ চলাচলের সুযোগ তৈরি করা হবে সেখানে। এছাড়া এবারের ড্যাপে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিনোদন পার্ক, তিন-চারটি করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কয়েক হাজার কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সংশোধিত ড্যাপ প্রসঙ্গে বলেন, এই ড্যাপে নতুন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হাঁটাপথ, নতুন রাস্তা ও জলাধার বাড়ানোর, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ও ঢাকাকে বাসযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমির মিশ্র ব্যবহারকেও উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে এটা করলে হিতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। যানজট নিরসন ও নগর সরকারের ব্যাপারেও কিছু কথা আছে। প্রস্তাবনাগুলো শুধু থাকলে হবে না। কারণ কিছু গ্রুপ সব সময় ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখে। ব্যবসায়ীরা যেন তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থকে বড় করে না দেখেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থের সংযোগও দরকার। ঢাকাকে ভারমুক্ত করতে হবে। না হলে পদ্মা থেকে পানি এনেও এ শহরকে বাঁচানো যাবে না। সব মিলিয়ে এ জন্য সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন।

ড্যাপ প্রণয়ন কমিটি মনে করে, রাজধানীর যেখানে-সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও এর বাসিন্দাদের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই। একটি বহুতল ভবনে যত যানবাহন যাতায়াত করে, তাতে আশপাশে প্রয়োজনীয় রাস্তা না থাকলে ওই এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। এ অবস্থার নিরসনে আবাসিক বহুতল ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

রাজউকের জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর ৯৯ শতাংশের বেশি ভবন আট তলার নিচে। আর আবাসিক ভবনের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভবনই আটতলার নিচে। যেমন, বংশাল এলাকার তিন হাজার ২৭টি ভবনের মধ্যে ১১ তলা ভবন আছে মাত্র দুটি। ১০ তলা আছে একটি ও ৯ তলা চারটির। আর আটতলা আছে ১৭টি। এক থেকে ছয়তলা ভবনই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে একতলা সর্বোচ্চ- ৬৬৪টি। শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়ায় সাত হাজার ৭২০টি ভবনের চিত্রও প্রায় একই রকম। এমনকি গুলশান-বনানী এলাকায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বহুতল ভবন থাকলেও মোট সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। আট হাজার ৩৩৯টি ভবনের মধ্যে আটতলা আছে ৬৪টি। ৯তলা ৭৪টি। ২২ ও ১৬ তলা আছে দুটি করে। প্রতিটি এলাকার চিত্র একই রকম। এ জন্য ড্যাপে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে এলাকা ভেদে ছয় থেকে আটতলা উচ্চতা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য রাস্তার প্রশস্ততা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তির বিবেচনায় এই বাধ্যবাধকতায় শিথিলতা রাখা হয়েছে। আর বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ রাখা হয়নি।

ড্যাপ প্রণয়ন কমিটির ডেপুটি টিম লিডার খন্দকার নিয়াজ রহমান বলেন, যেসব ভবন এর চেয়ে বেশি উঠে গেছে, সেগুলো থাকবে। ভবিষ্যতে সেসব ভবন আয়ুস্কাল হারালে তখন নতুন নিয়মে ভবন তৈরি হবে। এটা করার মূল উদ্দেশ্য রাজধানীর জনঘনত্ব কমানো।
রাজধানীর কয়েকটি এলাকাকে আবাসিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হলেও সেটা বাস্তব রূপ পায়নি। এক সময় ধানমন্ডি, গুলশান-বনানী, উত্তরাকে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব এলাকায় এখন নানা বাণিজ্যিক কার্যক্রম যুক্ত হয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমও চলছে এসব এলাকায়। এসব মিশ্র এলাকাকে আর আবাসিক হিসেবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আবার মিশ্র এলাকা হলে নাগরিকদের নানা সুবিধাও হয়। উন্নত বিশ্বও এখন মিশ্র এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে নগর পরিকল্পনা করছে।
বর্তমানে যে কোনো আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদনে ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী বা নিচতলায় পার্কিং স্পেস থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশোধিত ড্যাপে নিচতলার পার্কিং থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
এবার ড্যাপে রাস্তার প্রশস্ততা সর্বনিম্ন ৮ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে ছিল ৮ ফুট ৩ ইঞ্চি। তবে রাস্তা ৮ ফুটের চেয়ে কম প্রশস্ত হলে সেখানে দোতলার বেশি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হবে না। সে ক্ষেত্রেও জমির মালিককে আরও দুই ফুট জায়গা ছেড়ে সামনের রাস্তাকে ১০ ফুট প্রশস্ত করতে হবে।

এতদিন ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে রাস্তা তৈরির সুযোগ ছিল। এবার সেটা বন্ধ করে সেখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওয়ার তৈরির কথা বলা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খাল ভরাট করে কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তৈরির কারণে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তাই সব কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তুলে দিয়ে সেখানে নাব্য ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এতে ড্যাপ এলাকায় নতুন ৫৬৬ কিলোমিটার নতুন নৌপথ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া যানজট নিরসনে দুই হাজার ৭৪৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
ড্যাপ এলাকায় ৬২৭টি স্থানে সরকারি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ থাকবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ছোট প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকবে। এ বিবেচনায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে ড্যাপে।

রাজধানীতে নতুন করে জলাধার তৈরির জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় খেলার মাঠগুলোকে ১০ ফুট গভীরতায় খুঁড়ে নিচে পাথর-বালু দিয়ে একটি ফাঁপা ধরনের জলাধার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে ড্যাপে। এর ওপর থাকবে স্বাভাবিক খেলার মাঠ। বৃষ্টি হলেই ক্যাসপিটের মাধ্যমে পানি ওই ফাঁপার ভেতরে ঢুকে যাবে। ফলে ওইসব এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে না। এ রকম ৭৫টি জলাধার তৈরি করা হবে। পুরান ঢাকার লালবাগের আব্দুল আলীম পার্কের জলাবদ্ধতা রোধে পার্কের চারপাশের ওয়াকওয়ের নিচে এ রকম জলাধার তৈরি করে ভালো ফল পাওয়া গেছে বলে জানান ড্যাপ প্রণয়ন কমিটির সদস্য নগর পরিকল্পনাবিদ হিশাম উদ্দিন চিশতি।

এ ছাড়া বিনোদনের জন্য পাঁটটি আঞ্চলিক পার্ক, ৪৯টি জলপার্ক, পাঁচটি ইকো পার্ক ও আটটি ছোট আকৃতির পার্ক তৈরির কথা বলা হয়েছে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ড্যাপে আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো আগে ছিল না। যেমন বালু নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের জমির মালিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগে ড্যাপ প্রণয়নের সময় হাইড্রলজিক্যাল সার্ভে করা হয়নি। এবার হাইড্রলজিক্যাল সার্ভের ওপর নির্ভর করে ড্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে।facebook sharing button