শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ এখন মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম : ০৬:৪০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২০
  • / 67

চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ এখন মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাংস আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে। চাহিদার শতভাগ পালিত গবাদিপশুর মাধ্যমে পূরণের পথে অনেকটা এগিয়েছে দেশ। আর এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন শিক্ষিত তরুণ ও খামারিরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান এ প্রক্রিয়ায় ২০১৫ সালের মধ্যে মাংস রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ।  

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য মতে, বেকার তরুণদের বড় অংশ এখন বাণিজ্যিক খামারে মনোনিবেশ করছে। ফলে দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে খামার সংখ্যা ১২ লাখ। গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া মিলিয়ে গবাদিপশু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের ১২তম। আর ছাগলের সংখ্যা ও মাংস উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সামগ্রিকভাবে ছাগল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হচ্ছে ভারত ও চীন।     

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মূল্যায়ন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের যমুনাপারি ছাগলকে বিশ্বের অন্যতম জাত হিসেবে মনে করছে সংস্থা দুটি।

পাঁচ বছর আগেও দেশের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয়। এতে সৃষ্টি হয় প্রচুর মাংস সংকট। এ অবস্থায় বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৎপরতায় এক বছরের মধ্যেই দেশে কয়েক লাখ খামার তৈরি হয়ে যায়। বিগত তিন বছরে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা বার্ষিক গড় বেড়েছে ১৫-২৫ শতাংশ হার।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রকাশিত তথ্য বলছে, বিশ্বে ২০২০ সালে প্রায় ১৪৬ কোটি ৮০ লাখ গরু পালন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২১ কোটি ১৭ লাখ পালনের মাধ্যমে শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিল। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত ১৮ কোটি ৯০ লাখ, তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীন ১১ কোটি ৩৫ লাখ, চতুর্থ অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ৮ কোটি ৯২ লাখ এবং পঞ্চম অবস্থানে থাকা ইথিওপিয়ায় ৫ কোটি ৪০ লাখ গরু পালন হয়েছে এ বছর।

বর্তমানে শীর্ষ ১৫-তে থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা ৫ কোটি ১০ লাখ, সুদান ৪ কোটি ১৯ লাখ, পাকিস্তান ৩ কোটি ৮২ লাখ, মেক্সিকো ৩ কোটি ২৪ লাখ, অস্ট্রেলিয়া ২ কোটি ৯২ লাখ, তানজানিয়া ২ কোটি ৪৫ লাখ, বাংলাদেশ ২ কোটি ৪০ লাখ, কলম্বিয়া ২ কোটি ৩১ লাখ, নাইজেরিয়া ২ কোটি ও রাশিয়া ১ কোটি ৯৯ লাখ গরু পালন হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বাংলাদেশের গবাদিপশুর জাতগত বৈচিত্র্য নিয়ে একটি গবেষণা করছেন। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের গরুর চারটি জাত বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উন্নত জাত। চট্টগ্রামের লাল গরু, পাবনা গরু, উত্তরবঙ্গের ধূসর গরু ও মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের গরুর মাংসের মান ও স্বাদ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম । 

ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের গরু-ছাগল ছাড়াও ভেড়া, ঘোড়া ও মহিষের অনেকগুলো ভালো জাত আছে। সেগুলো থেকে উন্নতমানের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব। বিদেশ থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়াকে ইতিবাচক বর্ণনা করে তিনি বলেন, দেশে নতুন নতুন গরুর খামার গড়ে ওঠছে। সেখানে দেশি জাতের গরু-ছাগল পালন হচ্ছে। এতে একই সঙ্গে দেশি জাতগুলো রক্ষা পাচ্ছে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এক সময়  দেশে প্রতিবছর ২০-২২ লাখ গরু আমদানি হতো, সেটি ২০-২২ হাজারে নেমে এসেছে। এ তথ্যই বলে দেয় বাংলাদেশের অর্জন ও দেশটির সামর্থ্য। গরুর চাহিদা মেটাতে আমাদের এ স্বনির্ভরতার পেছনে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং গরু মোটাতাজাকরণের পাশাপাশি খামারিদের একান্ত আগ্রহ কাজ করেছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগের পেছনে ক্রিয়াশীল ভূমিকা রেখেছে। তবে গরু পালনে বৈশ্বিক অবস্থান সুদৃঢ় হলেও মাংসের দাম কমাতে আমরা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছি। সেটি মূলত গরু লালনপালনে খরচ বেশি হওয়ার কারণেই হচ্ছে। সেখানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, সরকারের উচিত বিদেশ থেকে গরু আমদানি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। আর দেশি জাত উন্নয়নের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো। তাহলে দেশি জাত দিয়েই আমরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। 

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নাথুরাম সরকার বলেন, গবাদিপশু উৎপাদনে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে। এছাড়া গরুর বংশবৃদ্ধি, মোটাতাজাকরণ ও কৃত্রিম গর্ভধারণের পাশাপাশি মানসম্পন্ন জাতের পশু উৎপাদনে ইনস্টিটউট থেকে খামারিদের সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়। আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে  দেশের চাহিদা মিটিয়ে মাংস রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নিউজ লাইট ৭১

Tag :

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ এখন মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ

আপডেট টাইম : ০৬:৪০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২০

চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ এখন মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাংস আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে। চাহিদার শতভাগ পালিত গবাদিপশুর মাধ্যমে পূরণের পথে অনেকটা এগিয়েছে দেশ। আর এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন শিক্ষিত তরুণ ও খামারিরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান এ প্রক্রিয়ায় ২০১৫ সালের মধ্যে মাংস রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ।  

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য মতে, বেকার তরুণদের বড় অংশ এখন বাণিজ্যিক খামারে মনোনিবেশ করছে। ফলে দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে খামার সংখ্যা ১২ লাখ। গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া মিলিয়ে গবাদিপশু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের ১২তম। আর ছাগলের সংখ্যা ও মাংস উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সামগ্রিকভাবে ছাগল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হচ্ছে ভারত ও চীন।     

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মূল্যায়ন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের যমুনাপারি ছাগলকে বিশ্বের অন্যতম জাত হিসেবে মনে করছে সংস্থা দুটি।

পাঁচ বছর আগেও দেশের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয়। এতে সৃষ্টি হয় প্রচুর মাংস সংকট। এ অবস্থায় বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৎপরতায় এক বছরের মধ্যেই দেশে কয়েক লাখ খামার তৈরি হয়ে যায়। বিগত তিন বছরে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা বার্ষিক গড় বেড়েছে ১৫-২৫ শতাংশ হার।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রকাশিত তথ্য বলছে, বিশ্বে ২০২০ সালে প্রায় ১৪৬ কোটি ৮০ লাখ গরু পালন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২১ কোটি ১৭ লাখ পালনের মাধ্যমে শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিল। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত ১৮ কোটি ৯০ লাখ, তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীন ১১ কোটি ৩৫ লাখ, চতুর্থ অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ৮ কোটি ৯২ লাখ এবং পঞ্চম অবস্থানে থাকা ইথিওপিয়ায় ৫ কোটি ৪০ লাখ গরু পালন হয়েছে এ বছর।

বর্তমানে শীর্ষ ১৫-তে থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা ৫ কোটি ১০ লাখ, সুদান ৪ কোটি ১৯ লাখ, পাকিস্তান ৩ কোটি ৮২ লাখ, মেক্সিকো ৩ কোটি ২৪ লাখ, অস্ট্রেলিয়া ২ কোটি ৯২ লাখ, তানজানিয়া ২ কোটি ৪৫ লাখ, বাংলাদেশ ২ কোটি ৪০ লাখ, কলম্বিয়া ২ কোটি ৩১ লাখ, নাইজেরিয়া ২ কোটি ও রাশিয়া ১ কোটি ৯৯ লাখ গরু পালন হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বাংলাদেশের গবাদিপশুর জাতগত বৈচিত্র্য নিয়ে একটি গবেষণা করছেন। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের গরুর চারটি জাত বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উন্নত জাত। চট্টগ্রামের লাল গরু, পাবনা গরু, উত্তরবঙ্গের ধূসর গরু ও মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের গরুর মাংসের মান ও স্বাদ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম । 

ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের গরু-ছাগল ছাড়াও ভেড়া, ঘোড়া ও মহিষের অনেকগুলো ভালো জাত আছে। সেগুলো থেকে উন্নতমানের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব। বিদেশ থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়াকে ইতিবাচক বর্ণনা করে তিনি বলেন, দেশে নতুন নতুন গরুর খামার গড়ে ওঠছে। সেখানে দেশি জাতের গরু-ছাগল পালন হচ্ছে। এতে একই সঙ্গে দেশি জাতগুলো রক্ষা পাচ্ছে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এক সময়  দেশে প্রতিবছর ২০-২২ লাখ গরু আমদানি হতো, সেটি ২০-২২ হাজারে নেমে এসেছে। এ তথ্যই বলে দেয় বাংলাদেশের অর্জন ও দেশটির সামর্থ্য। গরুর চাহিদা মেটাতে আমাদের এ স্বনির্ভরতার পেছনে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং গরু মোটাতাজাকরণের পাশাপাশি খামারিদের একান্ত আগ্রহ কাজ করেছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগের পেছনে ক্রিয়াশীল ভূমিকা রেখেছে। তবে গরু পালনে বৈশ্বিক অবস্থান সুদৃঢ় হলেও মাংসের দাম কমাতে আমরা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছি। সেটি মূলত গরু লালনপালনে খরচ বেশি হওয়ার কারণেই হচ্ছে। সেখানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, সরকারের উচিত বিদেশ থেকে গরু আমদানি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। আর দেশি জাত উন্নয়নের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো। তাহলে দেশি জাত দিয়েই আমরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। 

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নাথুরাম সরকার বলেন, গবাদিপশু উৎপাদনে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে। এছাড়া গরুর বংশবৃদ্ধি, মোটাতাজাকরণ ও কৃত্রিম গর্ভধারণের পাশাপাশি মানসম্পন্ন জাতের পশু উৎপাদনে ইনস্টিটউট থেকে খামারিদের সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়। আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে  দেশের চাহিদা মিটিয়ে মাংস রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নিউজ লাইট ৭১