শতভাগ ধূমপানমুক্ত আইন জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন সহায়ক
- আপডেট টাইম : ০৬:৩৭:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০
- / 96
তামাক পণ্যের ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়ার নিরাপদ কোনো মাত্রা নেই। তামাকের ধোঁয়ায় রয়েছে সাত হাজার রাসায়নিক পদার্থ, যার মধ্যে ৭০টিই হলো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। ফুসফুস ক্যান্সার, স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ পরোক্ষ ধূমপান। বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে পাবলিক প্লেসে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ রাখার সুযোগ থাকায় পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় আইনটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রচলিত আইনে সংশোধনী আনা প্রয়োজন।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭-এর তথ্য মতে, ৪২.৭ শতাংশ (৮১ লক্ষ) প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ কর্মক্ষেত্রে এবং প্রায় ৪৪ শতাংশ (২ কোটি ৫০ লাখ) মানুষ গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। এ ছাড়াও রেস্তোরাঁয় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন ৪৯.৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬১ হাজার শিশু পরোক্ষ ধূমপানজনিত বিভিন্ন অসুখে ভোগে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী পরোক্ষ ধূমপানের কারণে পৃথিবীতে বছরে ৬ লাখ মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরোক্ষ ধূমপানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ মোট তামাক ব্যবহারজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রায় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইকোনমিক কস্ট অব টোব্যাকো ইউজ ইন বাংলাদেশ : এ হেলথ কস্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির (চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হারানো) পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ১শ’ কোটি টাকা।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ অনুযায়ী চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্টসহ অধিকাংশ আচ্ছাদিত পাবলিক প্লেস এবং কর্মক্ষেত্রে ধূমপান নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে মাত্র কয়েকটি স্থান (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবন, গ্রন্থাগার, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র ও থিয়েটার হলের অভ্যন্তরে, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ এক কক্ষ বিশিষ্ট রেস্টুরেন্ট, শিশুপার্ক, খেলাধুলা ও অনুশীলনের জন্য নির্ধারিত আচ্ছাদিত স্থান এবং এক কামরা বিশিষ্ট পাবলিক পরিবহন) ব্যতীত বেশির ভাগ পাবলিক প্লেস এবং একাধিক কামরা বিশিষ্ট পাবলিক পরিবহনে (ট্রেন, স্টিমার ইত্যাদি) ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বা ‘ডেজিগনেটেড স্মোকিং জোন’ রাখার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ফলে অধূমপায়ীদের পাশাপাশি এসব স্থানে সেবা প্রদান করতে গিয়ে সেবাকর্মীরাও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। কাজেই বিদ্যমান আইনটি কোনোভাবেই পরোক্ষ ধূমপান থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) আর্টিক্যাল ৮-এর গাইড লাইন এবং অনেক গবেষণা দ্বারাও এটা স্বীকৃত যে, আচ্ছাদিত ধূমপান এলাকার আশপাশের স্থান কখনই ধোঁয়া মুক্ত হয় না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) কাজী জেবুন্নেছা বেগমের সঙ্গে দুই দিন দুই দফায় কথা বলার চেষ্টা করা হয়। প্রথম দিন তিনি জানান- তিনি অসুস্থ। সর্বশেষ শনিবার বিকেলেও মোবাইল ফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি বলেন, আমি বাইরে আছি। কথা বলা সম্ভব না।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব ও ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল সেলের কো-অর্ডিনেটর মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
অধূমপায়ীদের রক্ষায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বা ‘ডেজিগনেটেড স্মোকিং জোন’ বিলুপ্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া ধূমপানমুক্ত ভবন বলতে সেই ভবনের বারান্দাসহ সকল আচ্ছাদিত স্থানকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
শতভাগ ধূমপানমুক্ত আইন জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্র, রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের পাবলিক প্লেসকে শতভাগ ধূমপানমুক্ত করা গেলে কর্মীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ হ্রাস পায়, শ^াসতন্ত্র ভালো থাকে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমে যায়। এ ছাড়া ধূমপানমুক্ত পরিবেশে ধূমপায়ী কর্মীর সিগারেট সেবনের মাত্রা দিনে গড়ে ২ থেকে ৪টা পর্যন্ত হ্রাস পায়।
নিউজ লাইট ৭১























