বছরজুড়ে ধর্ষণ
- আপডেট টাইম : ০৯:২৪:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯
- / 134
নিউজ লাইট ৭১ রিপোর্ট: বিদায়ী বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে নারী-শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টাসহ যৌন নিপীড়নের যেন হিড়িক পড়ে। সমাজের বিভিন্নস্তরে ধর্ষকদের উৎপাত যখন আতঙ্কে রূপ নেয়, ঠিক তখনই রক্ষকও শামিল হয় ভক্ষকের ভূমিকায়।
এ বছর ধর্ষকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধর্ষণে মাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশেরও কতিপয় অসাধু সদস্য। ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় সর্বমহলে।
তার মধ্যে রাজধানীর ওয়ারীর বনগ্রামের সাত বছরের শিশু সামিয়া আফরিন সায়মাকে ছাদ ঘুরিয়ে দেখানোর কথা বলে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় বিবেক নাড়া দেয় বিবেকবান মানুষদের।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মিজমিজি অক্সফোর্ড হাইস্কুলের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম অন্তত ২০ ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়। কিছুদিন পর ফতুল্লার বায়তুল হুদা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল আমিনকে ১২ জন শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
রাজধানীর বাইরে ফেনীতে নুসরাতের ঘটনা পেছনে ফেলে অন্যসব যৌন হয়রানির ঘটনা। যে ঘটনায় আগুনে পুড়ে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরেও জিতে নুসরাত। আর ইতিহাসে নাম লিখায় অধ্যক্ষ সিরাজ ও ওসি মোয়াজ্জেম।
এছাড়াও রাজধানীসহ মাদারীপুর, যশোর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ধর্ষণের ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয় বছরজুড়ে। দেশজুড়ে ধর্ষক আর রক্ষকের একের পর এক বর্বরতার শিকার হয় অবোধ শিশু ও শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের নারীরা। জনমনে প্রশ্ন ওঠে শিশু ও নারীদের ওপর এ বর্বরতার শেষ কোথায়?
এ প্রশ্নের উত্তর আদৌ মেলেনি, যদিও ধর্ষণকাণ্ডে পুলিশ সদস্যদের জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে সে সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, এটা পুলিশের বিষয়। পুলিশই ভালো বলতে পারবে। এর বেশি তিনি আর মন্তব্য করতে চাননি।
বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে দেশে ছয় শতাধিক শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর একজন ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ জন শিশু মারা গেছে।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, বিদায়ী বছরে দেশের বিভিন্নস্থানে শিশুদের হত্যা ও নির্যাতনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। বছরজুড়ে সহস্রাধিক শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে যৌন হয়রানিসহ নানা কারণে ১১০ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, ৪৫ জন শিশু আত্মহত্যা করেছে। গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪২ জন শিশু।
অপরদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, বিদায়ী বছরে দুই হাজারের বেশি নারী ও মেয়েশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যাসহ অন্যান্য নির্যাতনের হারও অন্য সময়ের চেয়ে বেশি।
তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে মাঠপর্যায়ে আসে কঠোর বার্তা। কিন্তু তাতেও থামেনি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা।
খুলনা জিআরপি থানায় মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে ওসি ওসমান গনি পাঠানসহ পুলিশের পাঁচ সদস্য রাতভর এক গৃহবধূকে গণধর্ষণ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই যশোরের শার্শা উপজেলায় আরেক গৃহবধূকে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে সোর্সসহ পুলিশের এসআই খায়রুলের বিরুদ্ধে।
এর আগে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ শেষে মোক্তার হোসেন নামে মাদারীপুর থানার এক কনস্টেবল স্থানীয়দের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘরের ভেন্টিলেটর দিয়ে বাইরে ফেলে দেয় বলে অভিযোগ উঠে।
এসব খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারও হয়। গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় এসব ঘটনায় সর্বমহলে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাতে কি, পুলিশের অসাধু সদস্যরা এমন কাণ্ড থেকে বিরত হওয়ার নয়।
বরং বছরের শুরুতেই মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় টানা দুদিন আটকে রেখে এক নারীকে ধর্ষণ করে সাটুরিয়া থানারই উপ-পরিদর্শক (এসআই) সেকেন্দার হোসেন ও সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মাজহারুল ইসলাম।
ধর্ষণ ও মাদক সেবন করানোর বিরুদ্ধে ওই নারীর করা অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডেও নেয়া হয়।
এর আগে জানুয়ারী মাসেও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ছাতিয়ান এলাকায় বাড়ির লোকজন পার্শ্ববর্তী ছাতিয়ান বেপারী পাড়া মসজিদের ওয়াজ মাহফিলে ওয়াজ শুনতে গেলে এ সুযোগে একই এলাকার লতিফ মিয়ার ছেলে ও পুলিশ লাইনে কর্মরত কনস্টেবল মৃদুল মিয়া (২৩), সোলায়মানের ছেলে নিজাম মিয়া (২৪), সিয়াম হোসেন (২২) মিলেমিশে এক কিশোরী শিক্ষার্থীকে ঘর থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করে।
ধর্ষণে থেমে ছিল না নৌ-পুলিশের কনস্টেবলও। বছরের মাঝামাঝিতে বাগেরহাটের রামপালে এক কিশোরীকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগে নৌ-পুলিশের কনস্টেবল মুস্তাকিন বিল্লাহকে ধরে পুলিশে দেয় এলাকাবাসী।
মুস্তাকিন বিল্লাহ উপজেলার মোংলা-ঘষিয়াখালী নৌচ্যানেলের সন্ন্যাসী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল। এছাড়া খোদ রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এসএসসি পরীক্ষার্থী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে বাদল নামে এক পুলিশ কনস্টেবলসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ উঠে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি ওয়াজেদ মিয়ার বিরুদ্ধেও। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরপরই ব্যাপক সমালোচানার সৃষ্টি হয় সর্বমহলে। যদিও আদালতে গেলে বিষয়টি অন্যদিকে মোড় নেয়।
তবে বিদায়ী বছরে রাজধানীর বুকে বহুল আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) দুই পরিচালক শাকিল কামাল চৌধুরী ও মহিউদ্দিন সিকদারসহ পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হক।
চাকরি দেয়ার প্রলোভনে শাকিল কামাল ও মহিউদ্দিন ২৭ বছর বয়সি পঞ্চগড়ের এক তরুণীকে ফুসলিয়ে ধানমন্ডি ১৩ নম্বরের একটি বাসায় এনে গণধর্ষণ করে। এদের বিরুদ্ধে মামলাও করেন ওই তরুণী।
এছাড়া পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হকও রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেলে বোন পরিচয় দিয়ে ঢুকিয়ে ধর্ষণ করেন আরেক তরুণীকে। ওই তরুণীকে ওসি মাহমুদুলও চাকরির প্রলোভন দেন।
শারীরিক সম্পর্ক হয়ে গেলে বিয়েরও আশ্বাস দেন। কিন্তু তাও না করে উল্টো দিনের পর দিন শারীরিক মেলামেশা চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি।
তার ডাকে সাড়া না দিলে ওই তরুণীকে বিভিন্ন ধরনের হুমকিও দেয় ওসি মাহমুদুল। একই সময়ে দুই ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে আসায় দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় সৃষ্টি হয়।
বিদায়ী এ বছরটির শুরু থেকে শেষ অবধি রক্ষক ও ভক্ষকের ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নের ঘটনা জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এ যেন বছরজুড়ে মিলেমিশে রক্ষক-ভক্ষকের ধর্ষণে মাতোয়ারা হয়ে ওঠার বছর!
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক নুর খান বলেন, ক্ষমতা যাদের হাতে তারাই এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করছে। এর থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নারী-শিশুরাও।
খুলনায় পুলিশ কর্তৃক গণধর্ষণের ঘটনা, এর এক মাসের মধ্যে শার্শার ঘটনা এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ডের সংকট রয়েছে। নজরদারি এবং স্বচ্ছতারও অভাব রয়েছে।
এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এগুলো রোধ করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, পুলিশ প্রশাসন এবং সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
তা না হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে নৈতিকতার সংকট দেখা দেবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেই যদি এরকম ঘটনা ঘটে তাহলে সাধারণ মানুষ আশ্রয় নেবে কোথায় এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি।























