রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম : ০৬:২১:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২০
  • / 91

মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে-প্রচলিত এই প্রবাদকে ম্লান করে পৌষের প্রথম সপ্তাহেই শীতে স্থবির হয়ে পড়েছে সারা দেশ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতি খুবই নাজুক। উত্তর জনপদের পাশাপাশি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে চলা মৌসুমের প্রথম শৈত্যপ্রবাহে ভোগান্তি বেড়েছে জনজীবনে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার এ শৈত্যপ্রবাহ আরো দুদিন অব্যাহত থাকবে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামার সম্ভাবনা আছে।

গতকাল দেশের সর্বনিম্ন ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। শনিবার রাজারহাটে ছিল ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ছিল ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমের এ শৈত্যপ্রবাহ শুক্রবার থেকে শুরু হয়। সেদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল তেঁতুলিয়ায় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, শ্রীমঙ্গল, যশোর, কুষ্টিয়া ও বরিশালে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম গতকাল বলেন, রংপুর বিভাগ এবং গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, ফেনী, পাবনা, নওগাঁর বদলগাছি, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ভোলা ও বরিশালে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চলের অধিকাংশ জায়গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭-১০ ডিগি সেলসিয়াসের মধ্যে বিরাজ করছে। তিনি বলেন, ‘তাপমাত্রা সামান্য বাড়ছে। তবে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে আরো দু-একদিন। তারপর পরিস্থিতির উন্নতি হবে আশা করি।’

গতকাল দেশের সর্বনিম্ন ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। শনিবার রাজারহাটে ছিল ৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ছিল ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমের এ শৈত্যপ্রবাহ শুক্রবার থেকে শুরু হয়। সেদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল তেঁতুলিয়ায় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বড় এলাকাজুড়ে তাপমাত্রা নেমে ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে চলে এলে আবহাওয়াবিদরা তাকে বলেন মৃদু শৈত্যপ্রবাহ; থার্মোমিটারের পারদ ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এলে তাকে মাঝারি ও সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে বলে ধরা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এ সময়টায় মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা থাকতে পারে এবং দেশের অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা থাকতে পারে।

ঘরবন্দি মানুষ: শীতের তীব্রতা বাড়ায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। গরম পোশাক না থাকায় কাজের সন্ধানে বের হতে পারছেন না তারা। সময় গড়িয়ে দুপুর হতে চললেও দেখা নেই সূর্যের। কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে চারদিক। দিনেও যানবাহন চলছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে তেঁতুলিয়া ও রাজারহাটে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রংপুর বিভাগ এবং গোপালগঞ্জ, সীতাকুণ্ড, ফেনী, শ্রীমঙ্গল, পাবনা, বদলগাছী, যশোর, কুমারখালী, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল ও ভোলা জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আজও এ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

১০ ডিগ্রির নিচে ২৩ জেলা: প্রায় ২৩ জেলার তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে। দেশের উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলসহ প্রায় সারা দেশের ওপর দিয়েই বইতে শুরু করেছে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ। আগামী দুই দিনে তাপমাত্রা আরো কিছুটা কমতে পারে। এরপর তাপমাত্রা আবার কিছুটা বাড়বে।

আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে শৈত্যপ্রবাহ। এটি সোমবার (আজ) পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের এ প্রবাহের এলাকা আরো বিস্তার লাভ করতে পারে। মঙ্গলবার থেকে আবার তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা আছে।’

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগসহ টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ভোলা অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকতে পারে। রাতের তাপমাত্রা আরো কিছুটা কমতে পারে। দিনের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

তেঁতুলিয়া-রাজারহাট ছাড়াও ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে এমন এলাকাগুলো হচ্ছে টাঙ্গাইলে ৬ দশমিক ৮, সৈয়দপুরে ৭, চুয়াডাঙ্গা ও বদলগাছিতে ৭ দশমিক ৫, দিনাজপুর ও ঈশ্বরদীতে ৭ দশমিক ৬, তেঁতুলিয়ায় ৭ দশমিক ৮, রাজশাহী ও যশোরে ৮, শ্রীমঙ্গলে ৮ দশমিক ১, বগুড়া ও ডিমলায় ৮ দশমিক ৫, রংপুরে ৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এছাড়া ১০-এর নিচে আছে ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, তাড়াশ, কুমারখালী, বরিশাল ও ভোলা। এ ছাড়া অন্য এলাকাগুলোর তাপমাত্রাও কমে এখন ১৬ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই আছে।

এদিকে ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শনিবার ছিল ১৭ দশমিক ১, গতকাল তা ৩ ডিগ্রি কমে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামে ছিল ১৭ দশমিক ৪, গতকাল ১৫ দশমিক ৫, সিলেটে ছিল ১৪ দশমিক ২, গতকাল ১১ দশমিক ৩, খুলনায় ছিল ১৫ দশমিক ৫, গতকাল ১০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

উত্তরের জনজীবন স্থবির: দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়সহ আশপাশের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। জেঁকে বসেছে শীত। সব মিলিয়ে নাকাল উত্তরের জনজীবন। গতকাল সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। শুরু হয়েছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে কুড়িগ্রামে টিপটিপ করে বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরছে।

গত শনিবার সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে তা সারা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল না। গতকাল কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত টানা চার দিন তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল।

পঞ্চগড়ে উত্তরের হিমেল বাতাসে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। এদিকে গত শুক্রবার থেকে গতকাল পর্যন্ত সকাল সকাল রোদের দেখা মিলেছে। তবে হিমেল বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উত্তাপ ছড়াতে পারছে না সূর্য। এ কারণে দিনভরই শীতে জবুথবু থাকতে হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, দেশে ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকলে অতি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায় এবং ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রা বিরাজ করলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার কৃষক সলেমান আলী বলেন, সন্ধ্যার পর যে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যায়, সেটি মানুষকে কাবু করে দেয়। সারা রাত কনকনে ঠাণ্ডা। দিনের বেলা হালকা রোদ উঠলেও ঠাণ্ডা যায় না। সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে থাকা খুব কঠিন।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাসেল শাহ বলেন, গতকাল তেঁতুলিয়ায় ও রাজারহাটে যৌথভাবে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তেঁতুলিয়ায় আকাশে মেঘ আর কুয়াশা কমে গিয়ে উত্তরের বাতাসের দাপট বেড়েছে। এতে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। দিনের বেলা রোদের দেখা মেলায় দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে আগামী কয়েক দিন এই এলাকায় এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানান।

বোরো নিয়েও শঙ্কা: তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে নষ্ট হচ্ছে বোরোর বীজতলা। বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকনাশক ছিটিয়েও তেমন ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, গতকাল তৃতীয় দিনের মতো দেশে শৈত্যপ্রবাহ ছিল, যা অব্যাহত থাকতে পারে আজও। শস্যভাণ্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা তলানিতে নেমে গেছে। এ অবস্থায় বীজতলা পচে বোরোর চারা সংকট দেখা দেয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, তারা বীজতলায় ছত্রাকনাশক ছিটাচ্ছেন। কুয়াশার হাত থেকে বাঁচাতে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকেও রাখছেন। তবে অনেক সময় তাতেও কাজ হচ্ছে না। গত আমন এবং আউশ মৌসুমে বন্যা ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তারা ভালো ফলন পাননি। আর এবারের তীব্র শীত-কুয়াশার কারণে বোরো নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিনে রংপুর অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশ বেড়েছে। দিনের বড় অংশই কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকায় ক্ষেতে ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় চারা হলুদাভ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকের বীজতলায় চারা পোড়া ও ঝলসানো রোগও দেখা দিয়েছে।

নওগাঁ সদরের হোগলবাড়ি এলাকার কৃষক ময়েনউদ্দিন জানান, কয়েকদিন ধরেই সূর্যের দেখা নেই। এক জমিতে ধানের চারায় হঠাৎ ছোট ছোট সাদা পোকার আক্রমণ হয়েছে। আরেক জমিতে ১০-১৫ দিন বয়সী চারাগুলো সাদা ও লালচে রং ধরে মারা যাচ্ছে। বারবার কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

গত বন্যায় আমনের চারা নষ্ট হওয়ার পর এবার শৈত্যপ্রবাহে বোরোর চারা নষ্ট হওয়ার উপক্রম কুড়িগ্রামেও। উলিপুর উপজেলার চড়ুয়াপাড়া গ্রামের কৃষক হাকিম মিয়া জানান, বন্যায় আমন গেছে। তার আগে গতবছর বোরো ধান করে ফলন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য পাননি। এখন আবার এ বছর বোরো ধান ঠিকমতো না হলে বেশ বিপদে পড়বেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, দেশে গতবছর বোরোর ফলন হয়েছিল দুই কোটি এক লাখ ৮১ হাজার ৩৭৯ মেট্রিক টন। এ বছর বোরোর লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই কোটি পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু হাওর এলাকায় বোরো ধান রোপণ শুরু হয়েছে। অন্যান্য এলাকায় চারা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তবে চলমান শীতে বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে দাবি করেছেন কৃষি অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার মতো শীতের তীব্রতা এখনও হয়নি। যে সকল বীজতলা আক্রান্ত হয়েছে সেগুলো কিছুটা তাপমাত্রা বাড়লেই ঠিক হয়ে যাবে।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তার সিংহভাগই বোরো। এ সময়ের ধানের ফলনও তুলনামূলক বেশি। যেখানে প্রতি হেক্টর জমিতে আউশ ও আমনের ফলন যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৫ ও ২ দশমিক ৫০ মেট্রিকটন, সেখানে বোরোর ফলন ৪ মেট্রিকটনেরও বেশি।

কৃষকদের জন্য পরামর্শ: শীতের এমন পরিস্থিতিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিশেষ পরামর্শ দিয়েছে কৃষকদের জন্য। আমন ধান- বর্তমান আবহাওয়ায় ব্লাস্ট রোগ দেখা দিতে পারে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতি বিঘা জমিতে ট্রাইসাইক্লাজল/স্ট্রবিন গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ৬৭ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে শেষ বিকালে ৫-৭ দিন অন্তর দুবার স্প্রে করতে হবে।

ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে জমিতে পানি ধরে রাখতে হবে। বোরো ধান- বীজতলায় থ্রিপস পোকার আক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত জমিতে নাইট্রোজেন জাতীয় সার ব্যবহার করতে হবে। আলু- বর্তমান আবহাওয়ায় লেট ব্লাইট রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় রোগ প্রতিরোধের জন্য ৭ দিন পর পর ম্যানকোজেব গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। রোগাক্রান্ত হয়ে গেলে আক্রান্ত জমিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত সেচ দেয়া বন্ধ রাখতে হবে।

নিউজ লাইট ৭১

Tag :

শেয়ার করুন

মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে

আপডেট টাইম : ০৬:২১:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২০

মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে-প্রচলিত এই প্রবাদকে ম্লান করে পৌষের প্রথম সপ্তাহেই শীতে স্থবির হয়ে পড়েছে সারা দেশ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতি খুবই নাজুক। উত্তর জনপদের পাশাপাশি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে চলা মৌসুমের প্রথম শৈত্যপ্রবাহে ভোগান্তি বেড়েছে জনজীবনে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার এ শৈত্যপ্রবাহ আরো দুদিন অব্যাহত থাকবে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামার সম্ভাবনা আছে।

গতকাল দেশের সর্বনিম্ন ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। শনিবার রাজারহাটে ছিল ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ছিল ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমের এ শৈত্যপ্রবাহ শুক্রবার থেকে শুরু হয়। সেদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল তেঁতুলিয়ায় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, শ্রীমঙ্গল, যশোর, কুষ্টিয়া ও বরিশালে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম গতকাল বলেন, রংপুর বিভাগ এবং গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, ফেনী, পাবনা, নওগাঁর বদলগাছি, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ভোলা ও বরিশালে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চলের অধিকাংশ জায়গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭-১০ ডিগি সেলসিয়াসের মধ্যে বিরাজ করছে। তিনি বলেন, ‘তাপমাত্রা সামান্য বাড়ছে। তবে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে আরো দু-একদিন। তারপর পরিস্থিতির উন্নতি হবে আশা করি।’

গতকাল দেশের সর্বনিম্ন ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। শনিবার রাজারহাটে ছিল ৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ছিল ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমের এ শৈত্যপ্রবাহ শুক্রবার থেকে শুরু হয়। সেদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল তেঁতুলিয়ায় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বড় এলাকাজুড়ে তাপমাত্রা নেমে ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে চলে এলে আবহাওয়াবিদরা তাকে বলেন মৃদু শৈত্যপ্রবাহ; থার্মোমিটারের পারদ ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এলে তাকে মাঝারি ও সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে বলে ধরা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এ সময়টায় মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা থাকতে পারে এবং দেশের অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা থাকতে পারে।

ঘরবন্দি মানুষ: শীতের তীব্রতা বাড়ায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। গরম পোশাক না থাকায় কাজের সন্ধানে বের হতে পারছেন না তারা। সময় গড়িয়ে দুপুর হতে চললেও দেখা নেই সূর্যের। কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে চারদিক। দিনেও যানবাহন চলছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে তেঁতুলিয়া ও রাজারহাটে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রংপুর বিভাগ এবং গোপালগঞ্জ, সীতাকুণ্ড, ফেনী, শ্রীমঙ্গল, পাবনা, বদলগাছী, যশোর, কুমারখালী, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল ও ভোলা জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আজও এ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

১০ ডিগ্রির নিচে ২৩ জেলা: প্রায় ২৩ জেলার তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে। দেশের উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলসহ প্রায় সারা দেশের ওপর দিয়েই বইতে শুরু করেছে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ। আগামী দুই দিনে তাপমাত্রা আরো কিছুটা কমতে পারে। এরপর তাপমাত্রা আবার কিছুটা বাড়বে।

আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে শৈত্যপ্রবাহ। এটি সোমবার (আজ) পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের এ প্রবাহের এলাকা আরো বিস্তার লাভ করতে পারে। মঙ্গলবার থেকে আবার তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা আছে।’

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগসহ টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ভোলা অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকতে পারে। রাতের তাপমাত্রা আরো কিছুটা কমতে পারে। দিনের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

তেঁতুলিয়া-রাজারহাট ছাড়াও ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে এমন এলাকাগুলো হচ্ছে টাঙ্গাইলে ৬ দশমিক ৮, সৈয়দপুরে ৭, চুয়াডাঙ্গা ও বদলগাছিতে ৭ দশমিক ৫, দিনাজপুর ও ঈশ্বরদীতে ৭ দশমিক ৬, তেঁতুলিয়ায় ৭ দশমিক ৮, রাজশাহী ও যশোরে ৮, শ্রীমঙ্গলে ৮ দশমিক ১, বগুড়া ও ডিমলায় ৮ দশমিক ৫, রংপুরে ৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এছাড়া ১০-এর নিচে আছে ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, তাড়াশ, কুমারখালী, বরিশাল ও ভোলা। এ ছাড়া অন্য এলাকাগুলোর তাপমাত্রাও কমে এখন ১৬ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই আছে।

এদিকে ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শনিবার ছিল ১৭ দশমিক ১, গতকাল তা ৩ ডিগ্রি কমে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামে ছিল ১৭ দশমিক ৪, গতকাল ১৫ দশমিক ৫, সিলেটে ছিল ১৪ দশমিক ২, গতকাল ১১ দশমিক ৩, খুলনায় ছিল ১৫ দশমিক ৫, গতকাল ১০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

উত্তরের জনজীবন স্থবির: দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়সহ আশপাশের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। জেঁকে বসেছে শীত। সব মিলিয়ে নাকাল উত্তরের জনজীবন। গতকাল সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। শুরু হয়েছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে কুড়িগ্রামে টিপটিপ করে বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরছে।

গত শনিবার সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে তা সারা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল না। গতকাল কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত টানা চার দিন তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল।

পঞ্চগড়ে উত্তরের হিমেল বাতাসে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। এদিকে গত শুক্রবার থেকে গতকাল পর্যন্ত সকাল সকাল রোদের দেখা মিলেছে। তবে হিমেল বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উত্তাপ ছড়াতে পারছে না সূর্য। এ কারণে দিনভরই শীতে জবুথবু থাকতে হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, দেশে ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকলে অতি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায় এবং ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রা বিরাজ করলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার কৃষক সলেমান আলী বলেন, সন্ধ্যার পর যে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যায়, সেটি মানুষকে কাবু করে দেয়। সারা রাত কনকনে ঠাণ্ডা। দিনের বেলা হালকা রোদ উঠলেও ঠাণ্ডা যায় না। সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে থাকা খুব কঠিন।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাসেল শাহ বলেন, গতকাল তেঁতুলিয়ায় ও রাজারহাটে যৌথভাবে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তেঁতুলিয়ায় আকাশে মেঘ আর কুয়াশা কমে গিয়ে উত্তরের বাতাসের দাপট বেড়েছে। এতে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। দিনের বেলা রোদের দেখা মেলায় দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে আগামী কয়েক দিন এই এলাকায় এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানান।

বোরো নিয়েও শঙ্কা: তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে নষ্ট হচ্ছে বোরোর বীজতলা। বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকনাশক ছিটিয়েও তেমন ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, গতকাল তৃতীয় দিনের মতো দেশে শৈত্যপ্রবাহ ছিল, যা অব্যাহত থাকতে পারে আজও। শস্যভাণ্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা তলানিতে নেমে গেছে। এ অবস্থায় বীজতলা পচে বোরোর চারা সংকট দেখা দেয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, তারা বীজতলায় ছত্রাকনাশক ছিটাচ্ছেন। কুয়াশার হাত থেকে বাঁচাতে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকেও রাখছেন। তবে অনেক সময় তাতেও কাজ হচ্ছে না। গত আমন এবং আউশ মৌসুমে বন্যা ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তারা ভালো ফলন পাননি। আর এবারের তীব্র শীত-কুয়াশার কারণে বোরো নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিনে রংপুর অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশ বেড়েছে। দিনের বড় অংশই কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকায় ক্ষেতে ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় চারা হলুদাভ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকের বীজতলায় চারা পোড়া ও ঝলসানো রোগও দেখা দিয়েছে।

নওগাঁ সদরের হোগলবাড়ি এলাকার কৃষক ময়েনউদ্দিন জানান, কয়েকদিন ধরেই সূর্যের দেখা নেই। এক জমিতে ধানের চারায় হঠাৎ ছোট ছোট সাদা পোকার আক্রমণ হয়েছে। আরেক জমিতে ১০-১৫ দিন বয়সী চারাগুলো সাদা ও লালচে রং ধরে মারা যাচ্ছে। বারবার কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

গত বন্যায় আমনের চারা নষ্ট হওয়ার পর এবার শৈত্যপ্রবাহে বোরোর চারা নষ্ট হওয়ার উপক্রম কুড়িগ্রামেও। উলিপুর উপজেলার চড়ুয়াপাড়া গ্রামের কৃষক হাকিম মিয়া জানান, বন্যায় আমন গেছে। তার আগে গতবছর বোরো ধান করে ফলন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য পাননি। এখন আবার এ বছর বোরো ধান ঠিকমতো না হলে বেশ বিপদে পড়বেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, দেশে গতবছর বোরোর ফলন হয়েছিল দুই কোটি এক লাখ ৮১ হাজার ৩৭৯ মেট্রিক টন। এ বছর বোরোর লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই কোটি পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু হাওর এলাকায় বোরো ধান রোপণ শুরু হয়েছে। অন্যান্য এলাকায় চারা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তবে চলমান শীতে বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে দাবি করেছেন কৃষি অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার মতো শীতের তীব্রতা এখনও হয়নি। যে সকল বীজতলা আক্রান্ত হয়েছে সেগুলো কিছুটা তাপমাত্রা বাড়লেই ঠিক হয়ে যাবে।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তার সিংহভাগই বোরো। এ সময়ের ধানের ফলনও তুলনামূলক বেশি। যেখানে প্রতি হেক্টর জমিতে আউশ ও আমনের ফলন যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৫ ও ২ দশমিক ৫০ মেট্রিকটন, সেখানে বোরোর ফলন ৪ মেট্রিকটনেরও বেশি।

কৃষকদের জন্য পরামর্শ: শীতের এমন পরিস্থিতিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিশেষ পরামর্শ দিয়েছে কৃষকদের জন্য। আমন ধান- বর্তমান আবহাওয়ায় ব্লাস্ট রোগ দেখা দিতে পারে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতি বিঘা জমিতে ট্রাইসাইক্লাজল/স্ট্রবিন গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ৬৭ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে শেষ বিকালে ৫-৭ দিন অন্তর দুবার স্প্রে করতে হবে।

ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে জমিতে পানি ধরে রাখতে হবে। বোরো ধান- বীজতলায় থ্রিপস পোকার আক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত জমিতে নাইট্রোজেন জাতীয় সার ব্যবহার করতে হবে। আলু- বর্তমান আবহাওয়ায় লেট ব্লাইট রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় রোগ প্রতিরোধের জন্য ৭ দিন পর পর ম্যানকোজেব গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। রোগাক্রান্ত হয়ে গেলে আক্রান্ত জমিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত সেচ দেয়া বন্ধ রাখতে হবে।

নিউজ লাইট ৭১