এনআইডি সফটওয়্যার ফরেনসিক ল্যাবে
- আপডেট টাইম : ০৬:১২:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২০
- / 105
৭১: জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর এই জালিয়াতির সঙ্গে যারই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেবে কমিশন। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসায় বিষয়টি তদন্তে প্রশাসনিক ও টেকনিক্যাল দুটি কমিটি গঠন করে ইসি। প্রশাসনিক কমিটির তদন্ত প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আর রোহিঙ্গাদের এনআইডিসহ যে সফটওয়্যার ও ডিস্ক এদের ভোটার করতে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো পরীক্ষা করার জন্য ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় আটককৃতরা ইসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ইসি সূত্র জানায়, ভোটার তালিকায় বারবার রোহিঙ্গাদের যুক্ত পাওয়া যাচ্ছে। ভোটার হওয়ার পর এদের এনআইডি নম্বরও পড়ছে। সর্বশেষ চলতি বছর ভোটার তালিকায় থাকা এসব রোহিঙ্গার নাম বাদ দেওয়ার জন্য ইসিতে চিঠি দেন একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)।
জানা যায়, চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার নির্বাহী অফিসার সাদিয়া আফরিন কচি এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব বরাবর পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালের হালনাগাদকৃত ভোটার তালিকায় ১৩ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক অভিযোগের বিষয়ে যাচাই করা হয়। এ বিষয়ে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় অভিযুক্তদের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাইয়ের পর সর্বসম্মতভাবে অভিযুক্তরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক বলে সিদ্ধান্ত হয় এবং তাদের সবার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাতিল করার সুপারিশ করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয় ওই চিঠিতে।
ইসি সূত্র আরও জানায়, ইউএনওর এ চিঠি পাওয়ার পর বান্দরবান পার্বত্য জেলার জেলা নির্বাচন অফিসারের কাছে এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গত ১৩ আগস্ট সরেজমিন প্রতিবেদন ইসিতে পাঠান। তবে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সন্তোষজনক প্রতিবেদন দিতে পারেননি। পরে এ বিষয়ে গঠন করা হয় দুটি বিশেষ কমিটি।
রোহিঙ্গা ভোটার নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সর্বশেষ অবস্থা কীÑ জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ হলো ওখানে তো দুটি কমিটি। একটি হলো প্রশাসনিক সাইট থেকে আরেকটি হলো টেকনিক্যাল সাইট থেকে। প্রশাসনিক কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছে, সার্ভারের অন্যান্য বিষয় নিয়ে দেখছেন এবং ওখান থেকে রোহিঙ্গাদের এনআইডিগুলো যে আপলোড হলো সেগুলো কীভাবে হয়েছে। কীভাবে এন্ট্রি হলো, ম্যাচিং হলো, সম্পর্কযুক্ত কেউ ছিল কি-না। এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে এবং এটা চূড়ান্ত পর্যায়ে বলতে পারি। আর টেকনিক্যাল সাইট যেটি আছে, সেটি হলো এনআইডিগুলো ফরেনসিক পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়েছি। হার্ডওয়্যার যেগুলো ছিল, ডিস্ক যেগুলো ছিল, সেগুলো তারা কীভাবে ব্যবহার করল। তথ্যগুলো কীভাবে তারা ধারণ করল, কীভাবে তারা এগুলোর অপব্যবহার করল। এ বিষয়গুলো টেস্ট করার জন্য আমরা ফরেনসিকে পাঠিয়েছি।
এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় বড় কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকলে তাদের ছাড় পাওয়ার সুযোগ আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এনআইডি সংক্রান্ত যে অনিয়ম, সেটি রোধ করার জন্য আমি ডিজি হিসেবে এবং মাননীয় কমিশনের যেভাবে নির্দেশনা সেটি হলো আমরা জিরো টলারেন্স। বিন্দুমাত্র কাউকে ছাড় দেব না। এখন যে পর্যায়ের, যে পদবীর, যে কর্মকর্তাই হোক। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সে যেই হোক। কিন্তু তথ্য প্রমাণ এবং উপযুক্ত প্রমাণাদির সাপেক্ষে যদি কারও বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করব। সে যেই হোক। সুতরাং এ বিষয়ে কোনো কম্প্রমাইজ নেই। তদন্ত হলে তদন্তসাপেক্ষে যা বের হবে। যার বিরুদ্ধেই আসবে। আমরা কাউকেই ছাড় দেব না। যেই পর্যায়ের লোকই জড়িত থাক। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একদম স্পষ্ট।
এর আগে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ঠেকানো নির্বাচন কমিশনের একার কাজ নয় উল্লেখ করে রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়ে মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উপজেলাকে বিশেষ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় নতুন ভোটার নিবন্ধন করার জন্য একটি বিশেষ ফরম তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ভোটার হতে গেলে তাদের মা-বাবার এনআইডির কপি, নাগরিক সনদ, জন্ম নিবন্ধন সনদসহ বেশকিছু ডকুমেন্টস দিতে হচ্ছে। আর এগুলো কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকে সরবরাহ করা হয় না। এখন যেসব রোহিঙ্গা ভোটার হচ্ছেন- কে তাদের বাবা হচ্ছেন, কে তাদের নাগরিকত্ব সনদ দিচ্ছেন, কে জন্ম সনদ দিচ্ছেন? তাদের চিহ্নিত করে এ সমস্যা সমাধান করতে হবে। এনআইডি নিতে যেসব দলিল লাগে সেগুলো কীভাবে রোহিঙ্গারা পায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইসি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে এসব এলাকায় কড়া নজর রাখছে কমিশন। তারপরও এদের ভোটার তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা ঠেকানো যাচ্ছিল না। গত বছর রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডিÑ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশ হয়। এতে মাঠপর্যায়ে আরও কড়া নির্দেশনা দেয় ইসি। তখন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ৩২ উপজেলাকে বিশেষ এলাকা ঘোষণা করে সব উপজেলা-থানা নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, বিশেষ এলাকায় কেউ যাতে বিশেষ কমিটির সুপারিশ ছাড়া ভোটার হতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে কার্যালয়ে আসা ব্যক্তির বাংলাদেশি নাগরিকত্ব। সব সরঞ্জাম নিজের কাছে রাখতে হবে। সার্ভারে ডাটা এন্ট্রি অপারেটরকে দিয়ে তথ্য আপলোড করানো যাবে না। আর এসব বিষয় তদারকি করতে হবে জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে।
এ ছাড়া রোহিঙ্গারা যাতে কোনোভাবেই ভোটার হতে না পারে, সে বিষয়ে ১০ দফা নির্দেশনাসহ কঠোর নজরদারি রাখতে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারীদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সেসময় জানান ইসি সচিব। তিনি বলেছিলেন, এসব বিশেষ এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের বিশেষ কমিটি রয়েছে।
তখন দেওয়া ইসির নির্দেশনায় বলা হয়, বিশেষ তথ্য ফরমে প্রদত্ত সব জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর অলাইনে যাচাই করতে হবে। যাচাইকালে (ক) ভাই-বোনের ডাটাবেজে পিতা/মাতার নামের সঙ্গে আবেদনকারীর ফরম-১ এ উল্লেখিত পিতা/মাতার নামের মিল থাকতে হবে। (খ) চাচা/ফুফুর ডাটাবেজে তাদের পিতার নাম ও ঠিকানার সঙ্গে আবেদনকারীর বিশেষ তথ্য ফরমে প্রদত্ত পিতামহের নাম ও ঠিকানার মিল থাকতে হবে। (গ) প্রয়োজনে নিকট আত্মীয়ের মোবাইল নম্বরে কথা বলে তাদের পরিচিতি/তথ্য সম্পর্কিত বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।
এ ছাড়া উপজেলা বিশেষ কমিটি প্রতিটি ফরম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক সিদ্ধান্ত দেবে। রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়ে যদি কেউ তাদের সপক্ষে সহযোগিতা অথবা মিথ্যা তথ্য দেন বা মিথ্যা/জাল কাগজপত্র সরবরাহ করেন অথবা সংশ্লিষ্ট কারও গাফিলতি ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে বলেও জানানো হয়।
সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদ অনুযায়ী ইসির তালিকায় বর্তমানে মোট ১০ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার ১১২ জন ভোটার রয়েছেন।






















