ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ মানুষ হত্যা
- আপডেট টাইম : ০৫:২৯:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 41
মানুষের জীবন পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র, অমূল্য ও মর্যাদাময় সম্পদ। এ কারণেই ইসলামে মানুষ হত্যাকে জঘন্যতম পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পরকালে মহান আল্লাহ মানুষ হত্যাকারীকে কঠিনভাবে পাকড়াও করবেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন প্রথম যে বিষয়টির বিচার হবে, তা হলো রক্তপাত তথা মানুষ হত্যার।’ (সহিহ বুখারি)
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীর মাথার চুল ধরে টেনে নিয়ে আসবে আল্লাহর দরবারে। কণ্ঠনালিতে তখনো রক্ত ঝরবে। সে বলবে, ‘হে আল্লাহ! এ ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে।’ (তিরমিজি) পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে ইচ্ছাকৃত কোনো বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান হচ্ছে জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে।’ (সুরা নিসা ৯৩)
অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা। কিন্তু আজকের পৃথিবী যেন মানুষ হত্যার মহোৎসবে মেতে উঠেছে। অন্তঃসারশূন্য মতবাদের নামে প্রতিনিয়ত ঝরছে নিরীহ মানুষের রক্ত। গজিয়ে উঠেছে এক একটি আধুনিক জাহেলি যুগ, যেখানে বিবেক লোপ পেয়েছে, দয়ার চোখ অন্ধ হয়ে গেছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও জলে তাদের বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিজিক দিয়েছি এবং বহু সৃষ্টির ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” (সুরা বনি ইসরাইল ৭০) এই আয়াত কেবল আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নয়, বরং একটি চূড়ান্ত মানবিক নীতিমালার ঘোষণা করেছে। যেখানে প্রতিটি প্রাণকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকার দেওয়া হয়েছে। একটি শিশুর, একজন বৃদ্ধের, একজন দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের জীবনও স্রষ্টার দেওয়া মর্যাদার অধিকারী। তাই ইসলামে জীবনহানি কখনোই হালকাভাবে বিবেচ্য নয়। বরং তা আল্লাহর আরশকে কাঁপিয়ে দেয়। যে সমাজ এই নীতিকে অগ্রাহ্য করে, সেই সমাজ নিজের অস্তিত্বকে নিজের হাতে ধ্বংস করে।
জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নেয়ামত। এমন এক সম্পদ যার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। ইসলাম মানুষের জীবনের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ এবং নবী করিম (সা.) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অন্যায়ভাবে কারও জীবন নেওয়া ভয়াবহ পাপ। যা শিরকের পরে সবচেয়ে বড় অপরাধ। এই কাজ শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না, পুরো সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ভয়ংকরভাবে বিপন্ন করে।
বর্তমানে যখন আমরা নানা দিক থেকে হিংসা, সংঘাত ও হত্যাকাণ্ড দেখতে পাই, তখন আমাদের অবশ্যই ইসলামের এই শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে শান্তি ও মানবতার জন্য কাজ করতে হবে। কারণ মানুষের জীবন রক্ষা করাই ইসলামের মূল শিক্ষা এবং তা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুমিনের রক্ত, সম্মান ও সম্পদ অপর মুমিনের জন্য হারাম।’ (সহিহ মুসলিম) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য এতটাই পবিত্র, যতটা পবিত্র এই দিন, এই মাস এবং এই শহর।’ (সহিহ মুসলিম)
এমনকি বাইতুল্লাহর চেয়েও একজন মুমিনের জীবনের সম্মান অধিক। হজরত ইবনে ওমর (রা.) কাবাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘তুমি কত মর্যাদাবান! তবে একজন মুমিনের সম্মান আল্লাহর কাছে তোমার চেয়েও বেশি।’ (তিরমিজি) পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল।’ (সুরা মায়েদা ৩২)
মানুষের মৃত্যুর প্রভাব শুধু নিহত ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া, মা-বাবার জীবনে এক গভীর শোক, স্ত্রী ও সন্তানের জন্য এক জীবনের বেদনা, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের জন্য এক বড় শূন্যতা তৈরি করে। হত্যাকারী হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং এর মাধ্যমে সে নিজের এক অভিশপ্ত জীবন শুরু করে, যে জীবনে ইহকালীন কোনো শান্তি নেই এবং পরকালীন কোনো মুক্তি নেই।
নিউজ লাইট ৭১



















