পাথর লুটে বিএনপি-জামায়াত-আ.লীগ ‘ভাই ভাই’
- আপডেট টাইম : ০৪:১৪:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ অগাস্ট ২০২৫
- / 60
সিলেটের সাদাপাথর ও কোয়ারি এলাকা থেকে ব্যাপক পাথর লুটের ঘটনায় রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের মধ্যে চাঞ্চল্যকর ‘ঐক্য’ প্রকাশ পেয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা এই লুটপাটে জড়িত। শুধু তাই নয়, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, এমনকি বিজিবি সদস্যদেরও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, এই লুটকাণ্ডে প্রশাসনের পকেটে ঢুকেছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিএনপির সিলেট মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সভাপতি সাহাব উদ্দিনসহ ২০ জনের নাম উঠে এসেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের ৭ জন, জামায়াতের ৪ জন এবং এনসিপির ২ জন নেতার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, এই লুটপাটে রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার হাজার শ্রমিক প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন করেছে, যার ফলে সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের জড়িত থাকার অভিযোগ
তদন্তে জানা গেছে, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং বিজিবি সদস্যরা এই লুটপাটে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। প্রতি ট্রাক পাথরের জন্য ১০,০০০ টাকা এবং নৌকাপ্রতি ১,০০০ টাকা কমিশন দেওয়া হতো। এই অর্থ জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং বিজিবির মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। দুদকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮০ কোটি টাকা প্রশাসনের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ।
দুদক ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
লুটপাটের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দুদক ও যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে। গত ১৩ আগস্ট থেকে অভিযানে প্রায় ২.৫ লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১৩০টি ট্রাক জব্দ করা হয়। দুদকের সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. নাজমুস সাদাৎ জানিয়েছেন, জড়িতদের চিহ্নিত করতে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এছাড়া, জেলা প্রশাসনের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ১৩৭ জনের নাম সম্বলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
পরিবেশ ও পর্যটনের ক্ষতি
সাদাপাথর ও জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই লুটপাটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবেশকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের মদদে এই ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। হাইকোর্টের নির্দেশে সাত দিনের মধ্যে লুট হওয়া পাথর পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া
বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা দুদকের তালিকাকে ‘মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন। সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, আমরা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নই।”
এদিকে, বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কেউ প্রমাণ দিলে ব্যবস্থা নেব।”
সরকারের পক্ষ থেকে পাথর লুট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে, এই কাণ্ডে রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের ‘ঐক্য’ দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিউজ লাইট ৭১













