নীরবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি
- আপডেট টাইম : ০৬:৫৬:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১
- / 75
দেশের প্রথম ও একমাত্র সমুদ্রবিদ্যা বিষয়ে জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) বা বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট। কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার জঙ্গল গোয়ালিয়া পালংয়ে (মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন রেজু খালের পাশে) প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত।
সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা ও দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে গড়ে তোলা এ প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরুর পর দুই বছর পার করলেও লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে গেছে। অনেকটা নীরবেই দেশের সমুদ্র সম্পদের উন্নয়ন ও ব্যবহার নিশ্চিত করার কাজটি করে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিওআরআই’র ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সামুদ্রিক পরিবেশ ও জলবায়ু বিভাগ) আবু শরীফ মো. মাহবুব-উ-কিবরিয়া বলেন, আমরা ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছি। তবে আমাদের এখানে মানুষ খুব একটা আসে না। এমনকি সাংবাদিকরাও আসেন না। নীরবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য পাহাড়ঘেঁষে বিওআরআই’র দৃষ্টিনন্দন ভবন তৈরি করা হয়েছে। পাশেই বিজ্ঞানীদের জন্য আবাসিক ভবন। এলাকাজুড়ে নিরিবিলি পরিবেশ। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় একজন বিজ্ঞানীকে গবেষণা কাজে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়।
গবেষণার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমুদ্রের বিচে যে বালি থাকে, তার মধ্যে প্লাস্টিকের ছোট ছোট খণ্ড মিশে থাকে। সেই বালি নিয়ে এসে আমরা প্লাস্টিক আলাদা করি। সেটাই মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে- কোনটা কোন ধরনের প্লাস্টিক, কোনটা কোথায় পাওয়া যায়।
এই বিজ্ঞানী বলেন, সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি যখন এই প্লাস্টিকের ওপর পড়ে, তখন তা অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। প্লাস্টিকের কণা যখন সমুদ্রে থাকে তখন সমুদ্রের প্রাণী তা খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। যেটা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের প্রাণীরা হজম করতে পারে না এবং বিভিন্ন প্রাণী মারা যাচ্ছে। ঠিক একইভাবে এগুলো যখন বিচে এসে পৌঁছায়, তখন তা সমুদ্রের পাখি বা অন্যান্য জলজ প্রাণী খাচ্ছে এবং তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এরপর কথা হয় বিওআরআই’র ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-উ-কিবরিয়া’র সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের বেশকিছু ভিশন ও মিশন আছে। সমুদ্র সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে খনিজ, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, ও শিল্প ক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনাসহ মানবকল্যাণে এর সফল প্রয়োগ, সমুদ্রবিষয়ক শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং সমুদ্র সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবহার সম্পর্কিত জ্ঞানের উন্নীতকরণ এবং সমুদ্র পরিবেশ রক্ষার কার্যক্রম গ্রহণ নিয়ে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, সমুদ্র সম্পর্কিত সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের ব্যবস্থা করা, বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত সব সম্পদের উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণ, সমুদ্রের সব জীবসম্পদের অনুসন্ধান এবং স্থায়ী অর্থনৈতিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে এসব সম্পদের টেকসই উৎপাদন ত্বরান্বিত করা, অফসোর আইসল্যান্ড, উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্র তলদেশের খনিজ পদার্থ, প্লেসার ডিপোজিট, কয়লা, তৈল ও গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদের উপস্থিতি চিহ্নিতকরণ এবং গবেষণা পরিচালনা করাও আমাদের মিশনের মধ্যে আছে।
এছাড়া হাইড্রোগ্রাফি, সেডিমেনটেশন, জ্যোতির্বিদ্যা, আবহাওয়াবিদ্যা, নৌচালন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কিত জ্ঞানচর্চা ও বাণিজ্যিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করা, সমুদ্র এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কিত ব্যবসা-বাণিজ্যে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগের উৎসাহ জোগানো ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেবা প্রদান, সমুদ্র আইনসহ দেশের সমুদ্র সম্বন্ধীয় বিভিন্ন কৌশল, নীতিমালা ও পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব তৈরিসহ, এ সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তা প্রদান, সমুদ্রবিদ্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করাও প্রতিষ্ঠানটির মিশনের মধ্যে রয়েছে বলে জানান এই বিজ্ঞানী।
প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার পেছনের একটি চমকপ্রদত্ত ঘটনাও তুলে ধরেন আবু শরীফ মো. মাহবুব-উ-কিবরিয়া। তিনি জানান, ২০০৯ সালের ২ জুলাই একনেক সভায় চার একর জমির ওপর ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী জমির পরিমাণ চার একরের পরিবর্তে ৪০ একরে বৃদ্ধি করেন। তিনি প্রকল্প এলাকায় গবেষণাগার, আবাসিক ভবন, মেরিন অ্যাকুরিয়াম এবং বায়ুবিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। ২০১০ সালের মধ্যে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার জঙ্গল গোয়ালিয়া পালং মৌজায় ৪০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ সমাপ্ত হয়। বর্তমানে প্রকল্পটি ১০২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বামী একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ছিলেন। যে কারণে তিনি তার দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেয়েছিলেন মাত্র চার একর জমি দিয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই তিনি জমির পরিমাণ ৪০ একরে বৃদ্ধি করেন।
আবু শরীফ মো. মাহবুব-উ-কিবরিয়া বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গোপসাগরের মূল্যবান সম্পদ অনুসন্ধান আহরণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা এবং দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালেই সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর এ উদ্যোগ থেমে যায়। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সমুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রিভিউ কমিটি গঠন করেন। ওই রিভিউ কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর ২০০০ সালে জাতীয় সমুদ্র বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
তিনি আরও জানান, সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০০০ সালের জুন থেকে ২০০৫ সালের জুলাই মেয়াদে ‘জাতীয় সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়।
‘জাতীয় সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন (প্রথম পর্যায়) (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ল্যাবরেটরিসহ তিনতলাবিশিষ্ট ইনস্টিটিউট ভবন, তিনটি অফিসার্স কোয়ার্টার, দুটি স্টাফ কোয়ার্টার, মহাপরিচালকের বাসভবন, স্টাফ ডরমেটরি, অফিসার্স ডরমেটরি, ক্লাব ভবন, রেস্ট হাউজ, আনসার ভবন ও স্কুল-কাম কমিউনিটি ভবনসহ মোট ১৩টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং সমুদ্র গবেষণা উপযোগী ৬৬ ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে- বলে জানান এই বিজ্ঞানী।
জনবলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পের সার্বিক কাজ বাস্তবায়নের জন্য একজন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, তিনজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মচারীসহ মোট ১৪ জন কর্মরত আছেন। তাছাড়া প্রকল্পের আওতায় ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তার জন্য ১৬ জন আনসার এবং ইনস্টিটিউট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আটজন দৈনিকভিত্তিতে কর্মরত আছেন।
তিনি জানান, ২০১৫ সালের ৫ মার্চ জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৫’ পাস হয়, যা সমুদ্র গবেষণার জন্য একটি বড় অর্জন। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৫ (২০১৫ সালের ৭ নম্বর আইন) এর ৩ এর উপধারা (১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য ২০১৭ সালের ১৯ মে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০১৭ জারি করা হয়। এই ইনস্টিটিউটের জন্য মোট ২২৩টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্গানোগ্রামে পাঁচটি গবেষণা বিভাগ, একটি ওশানোগ্রাফিক ডাটা সেন্টারসহ চারটি প্রশাসনিক বিভাগ ও একটি মেডিকেল সেন্টার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তার ফসল হিসেবে দেশের পর্যটন ও শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে ইনস্টিটিউট এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি মেরিন অ্যাকুরিয়াম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ইতোমধ্যে হাতে নেয়া হয়েছে।
২০১২ সালের ১৮ মার্চ মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালের ৭ জুলাই ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ মামলায় বাংলাদেশের জয় লাভের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার লাভ করেছে। প্রায় বাংলাদেশের সমান এ এলাকার সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন বিওআরআই’র ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন, সমুদ্র উপকূল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, খনিজসম্পদ উত্তোলন এবং সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারসহ পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নের যে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের নবউন্মোচিত এই খাতটির সম্ভাবনা সীমাহীন। এ কারণে সমুদ্র বিষয়ক গবেষণা ও দক্ষ জনবল তৈরিতে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
নিউজ লাইট ৭১























