রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম : ০৭:২৫:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২০
  • / 118

দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু স্বামীর হাতেই নয়, নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন শাশুড়ি ও পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতেও। এক পরিসংখ্যানে চলতি বছরে দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনে ১৮ হাজারের অধিক মামলা হয়েছে বলা হলেও এ অবস্থা আরও ভয়াবহ বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনৈতিক অনিরাপত্তাবোধ, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসময় ঘরে বন্দিত্বের কারণে নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েছে। সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতার কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা ও আইনি কাঠামোতে সামগ্রিক পরিবর্তন না আসলে এ চিত্র বদলানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পরিসংখ্যান বলছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনে ১৮ হাজার ২২১টি মামলা দায়ের হয়েছে। নির্যাতনের শিকার নারীদের সহায়তায় সরকারের জাতীয় হেল্পলাইন ‘১০৯’ এ চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৯ লাখ ৩ হাজার ৮৩০ জন নারী ও শিশু সহায়তা নিয়েছেন। আর ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেলে জুলাই পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার ৪২ হাজার ৮৪৩ জন নারী ও শিশু চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮৪২ জন যৌন নির্যাতন ও ২৮ হাজার ৪৯৪ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) বলছে, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০ হাজার নারী, পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী প্রথমবারের মতো নির্যাতিত হয়েছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, কোভিড-১৯-এর কারণে লকডাউন চলাকালে নারীর ওপর সহিংসতার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত লকডাউন চলাকালে প্রথম দুই মাস (মার্চ ও এপ্রিল) এর তুলনায় মে মাসে পারিবারিক সহিংসতা ৩১ শতাংশ বেড়েছে। পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত যেসব নারী পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাদের ভিতর ৪৭ শতাংশ মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। এরপর প্রায় ৩০ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘বিশে^ এই করোনার সময় লকডাউনে নারী নির্যাতন ২০ ভাগ বেড়েছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। আর এখানে স্বাভাবিক অবস্থায়ও নারীর প্রতি সহিংসতা বেশি। এ সময় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণ হয়েছে বেশি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিশু-কিশোরীই বেশি যাদের বয়স ৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। শিশুধর্ষণের বেশির ভাগ ঘটনায় আশপাশের মানুষই দায়ী। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে করোনার কারণে নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা প্রতিমাসে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েছে বিশ্বব্যাপী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতার রূপও পরিবর্তিত হচ্ছে। এই সহিংসতার প্রধান শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের দায়িত্বে থাকা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে গেছে, এ তথ্যগুলো আমরা পাচ্ছি। যৌন হয়রানি, ধর্ষণের ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে বেশি ঘটছে। তবে নির্যাতনের যেসব ঘটনা সামনে আসছে, পরিস্থিতি এর চেয়েও নাজুক বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান। তিনি বলেন, অনেক ঘটনাই আমাদের সামনে আসছে না। পারিবারিক সহিংসতার সব ঘটনাগুলো আমরা জানতে পারছি না।’

নিউজ লাইট ৭১

Tag :

শেয়ার করুন

নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি

আপডেট টাইম : ০৭:২৫:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২০

দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু স্বামীর হাতেই নয়, নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন শাশুড়ি ও পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতেও। এক পরিসংখ্যানে চলতি বছরে দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনে ১৮ হাজারের অধিক মামলা হয়েছে বলা হলেও এ অবস্থা আরও ভয়াবহ বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনৈতিক অনিরাপত্তাবোধ, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসময় ঘরে বন্দিত্বের কারণে নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েছে। সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতার কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা ও আইনি কাঠামোতে সামগ্রিক পরিবর্তন না আসলে এ চিত্র বদলানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পরিসংখ্যান বলছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনে ১৮ হাজার ২২১টি মামলা দায়ের হয়েছে। নির্যাতনের শিকার নারীদের সহায়তায় সরকারের জাতীয় হেল্পলাইন ‘১০৯’ এ চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৯ লাখ ৩ হাজার ৮৩০ জন নারী ও শিশু সহায়তা নিয়েছেন। আর ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেলে জুলাই পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার ৪২ হাজার ৮৪৩ জন নারী ও শিশু চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮৪২ জন যৌন নির্যাতন ও ২৮ হাজার ৪৯৪ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) বলছে, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০ হাজার নারী, পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী প্রথমবারের মতো নির্যাতিত হয়েছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, কোভিড-১৯-এর কারণে লকডাউন চলাকালে নারীর ওপর সহিংসতার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত লকডাউন চলাকালে প্রথম দুই মাস (মার্চ ও এপ্রিল) এর তুলনায় মে মাসে পারিবারিক সহিংসতা ৩১ শতাংশ বেড়েছে। পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত যেসব নারী পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাদের ভিতর ৪৭ শতাংশ মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। এরপর প্রায় ৩০ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘বিশে^ এই করোনার সময় লকডাউনে নারী নির্যাতন ২০ ভাগ বেড়েছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। আর এখানে স্বাভাবিক অবস্থায়ও নারীর প্রতি সহিংসতা বেশি। এ সময় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণ হয়েছে বেশি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিশু-কিশোরীই বেশি যাদের বয়স ৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। শিশুধর্ষণের বেশির ভাগ ঘটনায় আশপাশের মানুষই দায়ী। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে করোনার কারণে নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা প্রতিমাসে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েছে বিশ্বব্যাপী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতার রূপও পরিবর্তিত হচ্ছে। এই সহিংসতার প্রধান শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের দায়িত্বে থাকা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে গেছে, এ তথ্যগুলো আমরা পাচ্ছি। যৌন হয়রানি, ধর্ষণের ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে বেশি ঘটছে। তবে নির্যাতনের যেসব ঘটনা সামনে আসছে, পরিস্থিতি এর চেয়েও নাজুক বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান। তিনি বলেন, অনেক ঘটনাই আমাদের সামনে আসছে না। পারিবারিক সহিংসতার সব ঘটনাগুলো আমরা জানতে পারছি না।’

নিউজ লাইট ৭১