‘কীসের করোনা?
- আপডেট টাইম : ০৬:৩৭:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২০
- / 89
রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে গাজীপুর রুটে বলাকা পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসে চালকের হেলপার বা সহকারী হিসেবে কাজ করেন সোলেমান আলম। ওই রুটে দৈনিক দুই থেকে তিনবার আসা-যাওয়া করতে হয় তাকে। প্রতিদিন বাসা থেকে মাস্ক নিয়ে বের হন ঠিকই, তবে প্রথম ট্রিপের পরে মাস্কের আর হদিস থাকে না তার। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১টার দিকে দ্বিতীয় ট্রিপে মাস্ক ছাড়াই গাজীপুরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাইলে সোলেমান বলেন, ‘বাসে যতক্ষণ থাকি, ততক্ষণই যাত্রী ডাকতে হয়। মাস্ক পইরা ডাকলে যাত্রীরা শুনে না, আবার মাস্ক পইরা ডাকলে মুখের থুতু মাস্কে লাইগে থাকে। তাই সব সময় মাস্ক মুখে পরে রাখতে পারি না।’
রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সামনে গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে আড্ডা দিচ্ছিলেন চার বন্ধু। তাদের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। কারো মুখেই ছিল না মাস্ক। অথচ বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন, নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান হাতিয়ার মাস্ক। টিকা না আসা পর্যন্ত মাস্কই ভরসা। অথচ বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের সামনে ভিড়ে সেই মাস্ক দেখা যায় কারো হাতে, কারো থুতনিতে। কেউ আবার রেখে দেন পকেটে। নানা বিষয়ে আলাপ করতে করতে ধূমপানও করছিলেন ওই চার যুবক। স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণ জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘কীসের করোনা? দেখেন তো কেউ মানছে কি না? সকলেই গা ঘেঁষে হাঁটাচলা করছে। এই নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নাই, যা হবার হবে। দেশের কোথাও কেউ মানে না, আমরা মেনে আর কী হবে?’
মাস্কের সঠিক ব্যবহার না করলে জরিমানা করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ বিষয়টি জানেন কি না জানতে চাইলে আরেক যুবক বলেন, ‘এখনো আমার চোখে পড়েনি। আপনারা কোথায় দেখেন অভিযান? অভিযান সঠিকভাবে চললে জরিমানার ভয়ে মাস্ক ছাড়া কেউ বাসা থেকে বের হতো না।’
গত মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তার আশপাশের এলাকায় রিকশা চালাচ্ছিলেন আজমত আলী। তার মুখে মাস্ক ছিল না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গরিব লোকের রোগ-শোক হয় না। দেহেন এ রোগে ধনী কতজন মারা গেছে আর গরিব কয়জনরে করোনা ধরছে। গরিব মানুষের এসব রোগ হয় না। এত দিন যাবৎ মাস্ক পরি নাই, কই আমাগো তো কিছু হয় নাই।’
রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘পাঠাও’-এর চালক রনির কাছে ‘মাস্ক পরা আর না পরা একই কথা’। মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পেটের টানে বাইর হইতে হয়, কত জায়গায় যাই। কত মানুষকে নিয়া যাই। কার গায়ে করোনা আছে, কেমনে কমু? মাস্ক পইরা থাকলেও তো করোনারে ঠেকান যাইব না।’
শীতে কোভিড সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কার মধ্যে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে প্রচারসহ নানা তৎপরতা চালাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান। মাস্ক না পরলে জরিমানাও করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এত কিছু সত্ত্বেও মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা যায় রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায়। গত কয়েক দিন তালতলা, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে এমন উদাসীনতার চিত্র চোখে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, এভাবে চলতে থাকলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। তিনি নিউজ লাইট ৭১ কে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের প্রয়োগ শুরু হওয়া পর্যন্ত সকল মানুষের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন। কিন্তু গত ৯ মাসেও আমরা এই মহামারি প্রতিরোধে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানতে এবং মানাতে ব্যর্থ হয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন যেসব অভিযান চলছে তা গত দুই মাসেও আমরা দেখিনি। ফলে মানুষের মনে মহামারিজনিত এক ধরনের ক্লান্তি চলে এসেছে। তাই বড় ধরনের ক্ষতির আগে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে এ মহামারি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।’
ডা. লেলিন চৌধুরী পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, অফিসের প্রধান, পরিবহনের নেতা এবং ধর্মীয় নেতাসহ সর্বস্তরের মানুষকে মহামারি প্রতিরোধে কাজে লাগানো প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘মুখে মাস্ক না পরে সেলফি তুলে আইন ভাঙায় সাড়ে ৩ হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হয়েছে চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্টিয়ান পিনেরাকে। আইনের এমন প্রয়োগ দেশের সর্বত্র দরকার।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন নিউজ লাইট ৭১ কে বলেন, ‘যেভাবে চলছে সেভাবেই চলতে দিলে সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে। এখন হয়তো ওঠানামা করছে। আমরা ভাইরাসকে যদি স্বাধীনভাবে চলতে দিই, তাহলে তারা বেড়েই যাবে। ঠিক অন্যভাবে আমরা যদি স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে ভাইরাসকে বাধা দিই; তাহলে সেটি দুর্বল হয়ে যাবে।’ তিনি পরামর্শ দিয়ে আরো বলেন, ‘পোশাক ছাড়া আমরা যেভাবে চলতে পারি না, মাস্কটা ওইভাবে নিয়ে চলা প্রয়োজন।’ সব মানুষরে মাস্ক নিশ্চিত করতে কর্মস্থল প্রধানকে কঠোরভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের দৈনিক সাত-আটটি টিম রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে র্যাবও অভিযান চালাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, অফিসগুলোতে মাস্ক না পরলে ঢুকতে দেওয়া হবে না এ বিষয়ের ওপরে জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে জরিমানা বাড়ানো বা জেল দেওয়ার বিষয়ে এখনো আমরা উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা পাইনি। ওপরস্থ কর্মকর্তারা এখনো মাঠের পরিস্থিতি দেখছেন।’
তবে জেলা প্রশাসক নতুন করে কাপড়ের তৈরি মাস্ক বিতরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
নিউজ লাইট ৭১























