আজ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায়
- আপডেট টাইম : ১০:২২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জানুয়ারী ২০২০
- / 156
নিউজ লাইট ৭১ রিপোর্ট: দেশের ইতিহাসের নারকীয় হত্যাযজ্ঞেরে মধ্যে বিডিআর বিদ্রোহের হত্যাকাণ্ড একটি। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে (বর্তমান বিজিবি) ঘটে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা।
সেদিন সকাল ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে বিজিবির বার্ষিক দরবার চলাকালে দরবার হলে ঢুকে পড়ে একদল বিদ্রোহী সৈনিক। এদের একজন তৎকালীন মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। এরপরই ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা।
এই ঘটনায় ২০০৯ সালের ৪ মার্চ লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নবজ্যোতি খীসা বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় ডিএডি তৌহিদসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি দেখানো হয় প্রায় এক হাজার বিডিআর জওয়ানকে।
কিন্তু নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে দুবছর আগে হাইকোর্ট এ মামলার আংশিক রায় প্রকাশ করেন। ফলে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়ায় দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে যারা বিস্ফোরক মামলার আসামি তারা হত্যামামলায় খালাসপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও বিস্ফোরক মামলায় জামিন আবেদন করতে পারছেন না। একইভাবে যাদের ইতোমধ্যে সাজাখাটা হয়ে গেছে তারাও মুক্তি পাচ্ছেন না।ফলে কোনো কোনো আসামি অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জানা গেছে, বিশ্বে আলোচিত মামলাগুলোর মধ্যে এই মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যাও বেশি। এ মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আাাসামিদের করা আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে রায়ও ঘোষণা করা হয়।
দীর্ঘদিন দেশি-বিদেশি মামলার রায় পর্যালোচনার পর আলোচিত এ মামলায় হাইকোর্টের রায় লেখা শেষ হয়েছে। এখন সর্বশেষ বৃহত্তর বেঞ্চের বিচারকরা তাদের স্বাক্ষরের পর আজ বুধবার (৮ জানুয়ারি) পূর্ণাঙ্গ রায় আকারে প্রকাশ করবেন হাইকোর্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রায় প্রদানকারী তিন বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার রায়ে এরই মধ্যে স্বাক্ষর করেছেন।
এর আগে নিম্ন আদালত ১৫২ জনের ফাঁসির রায় ঘোষণার পর ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরে হাইকোর্টও এর মধ্যে ডিএডি তৌহিদসহ ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়। বহুল আলোচিত এ মামলায় প্রায় দুবছর আগে হাইকোর্ট আংশিক রায় ঘোষণা করলেও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়নি এখনো।
২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর এ মামলায় নিম্ন আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ জনের মধ্যে ডিএডি তৌহিদসহ ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এছাড়া, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আট আসামিকে যাবজ্জীবন এবং চারজনকে খালাস দেন আদালত। একজন মারা গেছেন।
একইসঙ্গে বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখা হয়।বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড নেতা তোরাব আলীসহ ১২ জনকে খালাস দেন আদালত। এর মধ্যে দুজন মারা গেছেন।
এছাড়া, বিচারিক আদালতে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ২৫৬ আসামির মধ্যে ১২৮ জনকে ১০ বছর, আটজনের সাত বছর, চারজনকে ৩ বছর এবং দুই জনকে ১৩ বছর সাজা দেয়া হয়। ২৯ জন খালাস পান। ২৮ জন আপিল করেননি। মারা গেছেন তিনজন।
এদিকে নিম্ন আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ জনের মধ্যে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট। চারজনকে দেন ৭ বছর কারাদণ্ড।
২০১৫ সালে এ মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানির জন্য বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়। এই বেঞ্চে ৩৭০ কার্যদিবস আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি হয়।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআরের সদর দপ্তরে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়।
পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়। বিচার হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠসংলগ্ন অস্থায়ী এজলাসে। ঢাকা মহানগর তৃতীয় বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে বিডিআরের প্রাক্তন ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপি দলীয় প্রাক্তন সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু (প্রয়াত) ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৭৭ জনকে খালাস দেয়া হয়।
এ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, পিলখানা হত্যামামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের করা আপিলের ওপর সংক্ষিপ্ত একটা রায় (সর্ট অর্ডার পোষণ) ঘোষণা করা হয়েছে। এখন আমরা পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় রয়েছি। কারণ যারা দণ্ড পেয়েছেন তারা এই রায়ের কপি পাওয়ার পর আবার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন।
রায় প্রকাশের বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, সম্ভবত চলতি মাসের ১৫ তারিখের আগেই সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের একজন বিচারপতি অবসরে চলে যাবেন। তিনি অবসরে যাওয়ার আগেই রায়ে স্বাক্ষর করে যাওয়ার কথা। সে হিসেবে কাছাকাছি সময়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের একট সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় দুবছর আগে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন করেছেন হাইকোর্ট।
কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতা করা যাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী এ রায় প্রকাশের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায়ের কপি সরবরাহ করা হবে। কারা কর্তৃপক্ষ তা পড়ে শোনাবে। এরপর কোনো আসামি যদি আপিল করতে চান তবে সে সুযোগ থাকবে। কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হলে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি লাগবেই।
তিনি বলেন, এই মামলার কোনো কোনো আসামি বিস্ফোরক আইনের মামলাও আসামি। রায়ের কপি না পাওয়ার কারণে হত্যামামলায় খালাসপ্রাপ্তরা বিস্ফোরক মামলায় জামিন আবেদন করতে পারছেন না।
একইভাবে যাদের ইতোমধ্যে সাজা খাটা হয়ে গেছে তারাও মুক্তি পাচ্ছেন না। ফলে কোনো কোনো আসামি অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আশা করব এ মামলায় দ্রুত রায়ের কপি প্রকাশিত হবে এবং খালাসপ্রাপ্তরা কারাগার থেকে বের হয়ে মুক্তি পাবেন।
গতকাল মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট ডেপুটি অ্যাটার্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক নিউজ লাইট ৭১ কে জানান, এ ঐতিহাসিক মামলায় হাইকোর্টের রায় প্রস্তুত। আজ প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। আগামীকাল সকাল ১০টার দিকে এ রায় প্রকাশ করা হবে।













