সব যুদ্ধশিশু নাগরিকত্ব পাক
- আপডেট টাইম : ০৭:৪০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২২
- / 107
যুদ্ধশিশু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাবস্থার সুযোগে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী দুর্বৃত্তদের দ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার পর বীরাঙ্গনারা যেসব শিশুর জন্ম দেন, তাদের যুদ্ধশিশুরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতালীয় একটি চিকিৎসক দলের সমীক্ষার উল্লেখ করেছে, ঢাকায় ইউনিসেফের কর্মকর্তা এবং লীগ অব রেডক্রস সোসাইটিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার কয়েকবার আলোচনা হয়। এ আলোচনার পর তিনি অটোয়ায় সদরদপ্তরে যে প্রতিবেদন পেশ করেন, তাতে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের সংখ্যা দশ হাজারের মতো বলে উল্লেখ করা হয়।
উল্লিখিত দশ হাজার সংখ্যাটি যেকোনো নথিভুক্ত রেকর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুদ্ধশিশুদের আন্তঃদেশীয় দত্তক গ্রহণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত অনুরোধে প্রথম যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি যুদ্ধশিশুদের সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ দিতে এগিয়ে আসে সেটি হলো জেনেভাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সোস্যাল সার্ভিস (আইএসএস)-এর যুক্তরাষ্ট্র শাখা।
দুটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ঢাকা ভিত্তিক বাংলাদেশ সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন ফর উইমেন রিহ্যাবিলিটেশন এবং বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, আইএসএস-এর সঙ্গে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের পুরো সময় একত্রে কাজ করেছিল। বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের দত্তক গ্রহণের ব্যাপারে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে কানাডাই প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করে। মাদার তেরেসা ও তার মিশনারিজ অব চ্যারিটি সংস্থার সহকর্মীদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুটি কানাডীয় সংগঠন দত্তক গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে যেসব দেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়া। বিদেশি নাগরিকরা যাতে যুদ্ধশিশুদের সহজে দত্তক নিতে পারে সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিত্যক্ত শিশু (বিশেষ বিধান) আদেশ ১৯৭২ নামে একটি রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করা হয়।
১৯৭২ সালের ১৯ জুলাই ১৫ জন যুদ্ধশিশুর প্রথম দলটি বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পৌঁছলে কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে এ সংবাদটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। ১৯৭৪ সালে যুদ্ধশিশু প্রশ্নটির অবসান ঘটে। ততদিনে দত্তক হিসেবে বিদেশের মাটিতে যারা যাবার, তাদের অভিবাসন সম্পন্ন হয়; আর যারা স্বদেশে রয়ে যায় তারা স্বস্ব বাড়িতে বাংলাদেশের স্বাভাবিক সাধারণ নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে থাকে। দেশের বাইরে যারা বেড়ে উঠেছে তারা অনেকেই স্বদেশের মাটিতে আসে। গর্ববোধ করে।
বাংলাদেশে যারা রয়েছে তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের শিকার বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের ‘যুদ্ধশিশু’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলছে যাচাই-বাছাই। এতে কিছুটা সময় লাগছে। ফলে পরিকল্পনা থাকলেও আসন্ন বিজয় দিবসের (১৬ ডিসেম্বর) আগে বা পরে এ সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী স্বাধীনতা দিবসের (২৬ মার্চ) আগে এ আদেশ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৮২তম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর যুদ্ধশিশুদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাবার নাম লেখার প্রয়োজন হবে না। বাবার নাম ছাড়াই তারা রাষ্ট্রের সব সুবিধা বা অধিকার ভোগ করতে পারবেন।
চলতি বছর সেপ্টেম্বরে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত পচি বেগমের সন্তান মেরিনা খাতুনের যুদ্ধশিশু হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার আবেদন করেন। এরপরই এ সিদ্ধান্ত নেয় জামুকা। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনার সংখ্যা হালনাগাদ নয়। আমরা একটা কমন ঘোষণার দাবি করি যে, সব যুদ্ধশিশুকে নাগরিকত্ব দেয়া হোক। তাদের জানানো হোক- এটা তোমাদেরও দেশ।
নিউজ লাইট ৭১













