সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম : ১০:২০:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২
  • / 105

বছর বছর মাথাপিছু আয় বাড়লেও নির্ধারিত আয়ের মানুষের পাতের খাবারের তালিকা সংকুচিত হচ্ছে।  নিম্ন আয়ের মানুষ বা মধ্যবিত্ত  অধিকাংশই খাবারের মান কমিয়েছেন। সংসারের অন্য সব খরচেও টান পড়েছে। শখের জিনিসের পেছনে খরচ বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই। সবকিছু মিলে কষ্টে দিন পার করছেন সাধারণ মানুষ। মাথাপিছু আয় বাড়লেও এতে সাধারণ বা খেটে খাওয়া মানুষের পেট ভরছে না। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনে মাথাপিছু আয় বাড়ার যে কোনো প্রভাব নেই, তা বোঝা যায় জনৈক বিক্রয়কর্মীর জবানিতে।

ঢাকা নিউমার্কেটের একটি শাড়ির দোকানের এ বিক্রয়কর্মী জানান, তিনি মাসে বেতন ও কমিশন মিলে ২০ হাজার টাকা পান। তার দুই ছেলে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে পড়ে। বড় ছেলে ফিজিকস ও কেমিস্ট্রির জন্য কোচিং করত। কুলিয়ে উঠতে না পারায় গত মার্চ থেকে কোচিং বন্ধ করে দিয়েছেন। বাবার অসহায়ত্ব টের পেয়ে ছেলে একটি অনলাইনভিত্তিক খাবার বিক্রি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহকারীর চাকরি নিয়েছে। পাশাপাশি লেখাপড়াও চালাচ্ছে। কিন্তু এভাবে আর চলতে পারছেন এই বিক্রয়কর্মীর পরিবার। প্রতিদিনই কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছে। সন্তানের কোচিং বন্ধ করলেও কাগজ, কলম, পেনসিল, গ্রাফপেপার, বই দাম বাড়ার তালিকা থেকে কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না।

আটা-ময়দা, চাল-চিনি, তেল-সাবান, তরিতরকারি  সবটাই কিনতে হয় বাড়তি দামে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন সহসা তাদের বেতন বাড়ে না। অন্যদিকে করোনা মহামারীর জন্য প্রথম দুই বছর নিয়মিত বেতন হয়নি। মহামারী নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে নিয়মিত বেতন হচ্ছে। সরকারের মাথাপিছু আয়ের যে ফর্মুলা তাতে প্রতি বছরই বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়ে থাকে। ফর্মুলা অনুযায়ী জিনিসপত্রের যেমন দাম বাড়ে, তেমনি শ্রমের মজুরিও বাড়ে বছর বছর। খাদ্যের পেছনে মানুষকে এখন তার আয়ের বেশিরভাগ অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে জরুরি খাদ্যপণ্যের দাম ৩৬ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ ডলারে উঠলেও বাস্তবে দেশের প্রতিটি মানুষের আয় তা নয়। কারণ, মাথাপিছু আয় কোনো ব্যক্তির একক আয় নয়।

দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি রেমিট্যান্সসহ যত আয় হয়, তা দেশের মোট জাতীয় আয়। সেই জাতীয় আয়কে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় বের হয়। মাথাপিছু আয়ের যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে তা সঠিকভাবে করা হচ্ছে কি না, সেটি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এত আয়ের পরও সাধারণ মানুষ সংসার চালাতে পারছে না। বাস্তবতা হচ্ছে, কতিপয় মানুষের কাছে সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে সমাজে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার কত, সরকারিভাবে তা প্রকাশ করা হয়নি। গত দুই বছরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন বা মজুরি কর্তনে মানুষের আয় কমেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। আর চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতি আয় কমে যাওয়া মানুষের দুর্গতি বাড়িয়েছে বহুগুণ।  মহামারী শুরুর পর শ্রম মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার বেশি হয়েছে, যা এখনো বহাল রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে দেশের স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষ যখন দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন দেশে কোটিপতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ১৩ বছরে দেশের ব্যাংকগুলোতে এক কোটি বা তার চেয়ে বেশি পরিমাণের আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। তার মানে বিষয়টি স্পষ্ট, অজস্র মানিুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে আবার অজস্র কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে সিন্ডিকেট, দ্রব্যমূল্য কিন্তু কৃষক-শ্রমিক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না।

দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা গেলে এই সংকট এতটা বাড়ত না। আগামী বছর সম্ভাব্য খাদ্যসংকট মোকাবিলার জন্য সবাই তৈরি হলেও এই বৈষম্য-সিন্ডিকেট থাকলে সংকট ঘনীভ‚ত হবে। তাই বৈষম্য কমাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল জরুরি ব্যবস্থা নেবে- এ প্রত্যাশা আমাদের।

নিউজ লাইট ৭১

Tag :

শেয়ার করুন

বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি

আপডেট টাইম : ১০:২০:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

বছর বছর মাথাপিছু আয় বাড়লেও নির্ধারিত আয়ের মানুষের পাতের খাবারের তালিকা সংকুচিত হচ্ছে।  নিম্ন আয়ের মানুষ বা মধ্যবিত্ত  অধিকাংশই খাবারের মান কমিয়েছেন। সংসারের অন্য সব খরচেও টান পড়েছে। শখের জিনিসের পেছনে খরচ বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই। সবকিছু মিলে কষ্টে দিন পার করছেন সাধারণ মানুষ। মাথাপিছু আয় বাড়লেও এতে সাধারণ বা খেটে খাওয়া মানুষের পেট ভরছে না। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনে মাথাপিছু আয় বাড়ার যে কোনো প্রভাব নেই, তা বোঝা যায় জনৈক বিক্রয়কর্মীর জবানিতে।

ঢাকা নিউমার্কেটের একটি শাড়ির দোকানের এ বিক্রয়কর্মী জানান, তিনি মাসে বেতন ও কমিশন মিলে ২০ হাজার টাকা পান। তার দুই ছেলে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে পড়ে। বড় ছেলে ফিজিকস ও কেমিস্ট্রির জন্য কোচিং করত। কুলিয়ে উঠতে না পারায় গত মার্চ থেকে কোচিং বন্ধ করে দিয়েছেন। বাবার অসহায়ত্ব টের পেয়ে ছেলে একটি অনলাইনভিত্তিক খাবার বিক্রি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহকারীর চাকরি নিয়েছে। পাশাপাশি লেখাপড়াও চালাচ্ছে। কিন্তু এভাবে আর চলতে পারছেন এই বিক্রয়কর্মীর পরিবার। প্রতিদিনই কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছে। সন্তানের কোচিং বন্ধ করলেও কাগজ, কলম, পেনসিল, গ্রাফপেপার, বই দাম বাড়ার তালিকা থেকে কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না।

আটা-ময়দা, চাল-চিনি, তেল-সাবান, তরিতরকারি  সবটাই কিনতে হয় বাড়তি দামে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন সহসা তাদের বেতন বাড়ে না। অন্যদিকে করোনা মহামারীর জন্য প্রথম দুই বছর নিয়মিত বেতন হয়নি। মহামারী নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে নিয়মিত বেতন হচ্ছে। সরকারের মাথাপিছু আয়ের যে ফর্মুলা তাতে প্রতি বছরই বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়ে থাকে। ফর্মুলা অনুযায়ী জিনিসপত্রের যেমন দাম বাড়ে, তেমনি শ্রমের মজুরিও বাড়ে বছর বছর। খাদ্যের পেছনে মানুষকে এখন তার আয়ের বেশিরভাগ অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে জরুরি খাদ্যপণ্যের দাম ৩৬ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ ডলারে উঠলেও বাস্তবে দেশের প্রতিটি মানুষের আয় তা নয়। কারণ, মাথাপিছু আয় কোনো ব্যক্তির একক আয় নয়।

দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি রেমিট্যান্সসহ যত আয় হয়, তা দেশের মোট জাতীয় আয়। সেই জাতীয় আয়কে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় বের হয়। মাথাপিছু আয়ের যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে তা সঠিকভাবে করা হচ্ছে কি না, সেটি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এত আয়ের পরও সাধারণ মানুষ সংসার চালাতে পারছে না। বাস্তবতা হচ্ছে, কতিপয় মানুষের কাছে সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে সমাজে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার কত, সরকারিভাবে তা প্রকাশ করা হয়নি। গত দুই বছরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন বা মজুরি কর্তনে মানুষের আয় কমেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। আর চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতি আয় কমে যাওয়া মানুষের দুর্গতি বাড়িয়েছে বহুগুণ।  মহামারী শুরুর পর শ্রম মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার বেশি হয়েছে, যা এখনো বহাল রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে দেশের স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষ যখন দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন দেশে কোটিপতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ১৩ বছরে দেশের ব্যাংকগুলোতে এক কোটি বা তার চেয়ে বেশি পরিমাণের আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। তার মানে বিষয়টি স্পষ্ট, অজস্র মানিুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে আবার অজস্র কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে সিন্ডিকেট, দ্রব্যমূল্য কিন্তু কৃষক-শ্রমিক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না।

দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা গেলে এই সংকট এতটা বাড়ত না। আগামী বছর সম্ভাব্য খাদ্যসংকট মোকাবিলার জন্য সবাই তৈরি হলেও এই বৈষম্য-সিন্ডিকেট থাকলে সংকট ঘনীভ‚ত হবে। তাই বৈষম্য কমাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল জরুরি ব্যবস্থা নেবে- এ প্রত্যাশা আমাদের।

নিউজ লাইট ৭১